অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে নেপাল। জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়ে চরম পথ বেছে নিচ্ছেন দেশটির তরুণ প্রজন্ম। গত তিন দিনে তিন যুবক শরীরে পেট্রোল ঢেলে আত্মাহুতির চেষ্টা করেছেন, যার মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো নেপালের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া তীব্র বিক্ষোভের মুখে এখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। বিক্ষোভকারীদের দাবি, বর্তমান সংকট নিরসনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, তাই অবিলম্বে তার পদত্যাগ প্রয়োজন। রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নেমে হাজার হাজার মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। প্রধান বিরোধী দল নেপালি কংগ্রেসের অভিযোগ, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি সরকার।

তরুণদের সংগঠন ‘জেন-জি নেপাল’ আরও কঠোর ভাষায় সরকারের সমালোচনা করে বলেছে, বর্তমান প্রশাসন জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে। তাদের মতে, বেকারত্ব দূর করা, আয় বৃদ্ধি এবং তরুণদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের বাজেট ও নীতিমালায় কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেই।

বর্তমান এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২০২৩ সালে প্রেম আচার্যের আত্মাহুতির ঘটনাটি আবারও আলোচনায় এসেছে। সে সময় কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বালেন্দ্র শাহ এই ঘটনাটিকে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু এখন যখন একই পরিস্থিতি পুনরায় তৈরি হয়েছে, তখন তার নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীরা। বিশ্লেষকদের মতে, এই আত্মহত্যার ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তিগত হতাশা নয়, বরং এটি নেপালের তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সরকারি নীতির অকার্যকারিতার এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বালেন্দ্র শাহ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। শহর পরিচ্ছন্নতা, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ এবং দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অভিযান চালিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। তবে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সময় হকার ও বস্তিবাসীদের একটি অংশের সাথে তার সংঘাত তৈরি হয়েছিল। রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক জগতেও তার প্রভাব ছিল প্রবল। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় তার গাওয়া ‘নেপাল হাসেকো’ (হাসছে নেপাল) গানটি প্রতিবাদের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে ওই আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন দল অভাবনীয় জয়লাভ করে, যা নেপালের প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ছিল এক বড় ধাক্কা। ঝাপা-৫ আসনে অভিজ্ঞ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে পরাজিত করে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি নেপালের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তবে সেই জনপ্রিয়তার আলো এখন সংকটের কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি