ইউরোপের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ ‘ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব অনুষদ’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার শহরে নির্মাণাধীন ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এর অধীনে এই অনুষদটি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ২০২৭ সালে এই বিশাল ক্যাম্পাসের পূর্ণাঙ্গ উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট থিওলজির পাশাপাশি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বিভাগকেও একই আঙিনায় নিয়ে আসা হবে, যা ধর্মীয় গবেষণার ক্ষেত্রে এক অনন্য ও সমন্বিত পরিবেশ তৈরি করবে। জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচ ভেলে বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।

নবগঠিত এই অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিন মোহানাদ খোরশিদে এই অর্জনকে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেছেন। মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন খোরশিদে বলেন, এই সাফল্য তাকে গভীর কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দিয়েছে। তিনি ইসলামের একটি উদার, আলোকিত ও মুক্তমনা ব্যাখ্যার প্রচার ও প্রসারের বিষয়ে তাঁর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, এই নতুন অনুষদের প্রভাব কেবল ইউরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

উল্লেখ্য, এর আগে খোরশিদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজি’-র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অনুষদ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় এখন থেকে ইসলামি থিওলজি বিভাগ নিজস্বভাবে পিএইচডি (PhD) এবং উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রি প্রদান করতে পারবে। এর ফলে একাডেমিক গবেষণার মানোন্নয়ন এবং তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে বড় ধরনের গবেষণা তহবিল সংগ্রহ করা অনেক সহজতর হবে। ২০১২ সালে মাত্র ১৫ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই কেন্দ্রটি এখন এক বিশাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে আটজন অধ্যাপকসহ ৫০ জনেরও বেশি কর্মী কর্মরত আছেন এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন খোরশিদে।

জার্মানির বিভিন্ন সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা চালু হওয়ায় বর্তমানে দক্ষ শিক্ষকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশটির অন্যতম জনবহুল রাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ায় প্রায় ৩ হাজার ইসলাম ধর্মশিক্ষকের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সেখানে মাত্র ৩৩০ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এই শূন্যস্থান পূরণে এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে ২০২৭ সাল থেকে ‘ইসলাম ও সমাজকর্ম’ নামে একটি নতুন স্নাতকোত্তর (Master's) কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। খোরশিদে জানান, এই কোর্সের মাধ্যমে যুবসেবা, হাসপাতালের ধর্মীয় পরামর্শদাতা এবং প্রবীণদের সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করা সম্ভব হবে।

অনুষদের পাঠ্যক্রম ও নীতিমালায় ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা, কোরআনের সমসাময়িক ও গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং আন্তধর্মীয় সংলাপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চরমপন্থা, ইহুদি-বিদ্বেষ এবং ইসলামবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টিও অনুষদের নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খোরশিদে জানান, এই ঘোষণার পর থেকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকেও এই সংবাদটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ একটি মুক্তমনা ও আধুনিক ইসলামের আকাঙ্ক্ষা করে এবং মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদে ইসলামের ভবিষ্যৎ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবার্ট রবার্স বলেন, একই ছাদের নিচে খ্রিস্টান ও ইসলামি থিওলজিকে একত্রিত করার এই উদ্যোগ অত্যন্ত শক্তিশালী একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে। অন্যদিকে, জার্মানির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আনেত্তে শাভান এই পদক্ষেপকে একটি মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এটি ইউরোপজুড়ে একাডেমিক ধর্মতত্ত্বের অবস্থানকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করবে।