ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু—বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এই নামটি কেবল একটি সংগঠনের নয়, বরং এটি অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। কখনো ভাষার অধিকারের আন্দোলন, কখনো স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণ, আবার কখনো সাধারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম; ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এবং প্রতিটি উত্তাল সময়ে রাজপথের আন্দোলনের সাথে মিশে আছে ডাকসুর নাম। এই গৌরবময় ইতিহাসের এক সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মাওলানা গোলাম আযম। কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত হয়েছে শিক্ষার্থীদের চাহিদা এবং প্রত্যাশা। আর সেই পরিবর্তিত সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ডাকসুতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সাদিক কায়েমের নেতৃত্ব যেন ইতিহাসের সেই পুরোনো অধ্যায়কেই এক নতুন ও আধুনিক রূপে সামনে নিয়ে এসেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪৭-৪৮ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন মাওলানা গোলাম আযম। তাঁর নেতৃত্বাধীন ডাকসু ছিল তৎকালীন সময়ে ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম। ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে জিএস হিসেবে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ও দিকনির্দেশনার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলে ও বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তবে সেই সোনালী সময়ের পর ডাকসুর পথচলায় দীর্ঘ বিরতি আসে। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের পর প্রায় তিন দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসু নির্বাচন বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা নানা অনিয়ম, কারচুপি এবং অভিযোগের মুখে পড়ে, যা শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

নির্বাচনী জয় এবং নেতৃত্বের এই দৃশ্যপট আমূল বদলে যায় গত বছরের ঠিক এই সময়ে। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ১৪ হাজার ৪২টি ভোট পেয়ে ভিপি (সহ-সভাপতি) পদে নির্বাচিত হন ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েম। কেবল ভিপি পদই নয়, একই প্যানেলের প্রার্থীরা জিএস এবং এজিএস পদেও জয়লাভ করেন। এর ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ডাকসুর শীর্ষ নেতৃত্বে আসে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত একটি প্যানেল। বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, সাদিক কায়েমের নেতৃত্বাধীন এই ডাকসু পরিষদের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে এই এক বছরের সময়কাল শিক্ষার্থীদের মনে একটি বড় প্রশ্ন জাগিয়েছিল—ভোটের সেই বিপুল জয় কি শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে?

এক বছরের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর কেবল মৌখিক বক্তব্যে নয়, বরং বিভিন্ন খাতের বাস্তব উন্নয়নমূলক কাজে প্রতিফলিত হয়েছে। ডাকসুতে সাদিক কায়েমের নেতৃত্বাধীন প্যানেল দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম চার মাসেই ৩৩টি ভিন্ন ভিন্ন খাতে মোট ২২৫টি কাজ ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ‘ডাকসুর চার মাস: কার্যবিবরণী ও জবাবদিহি’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। আবাসন সমস্যা সমাধান, উন্নত চিকিৎসা সেবা, যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন—দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে একের পর এক যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুসারে, দায়িত্ব গ্রহণের পর ডাকসুর অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল স্বাস্থ্যসেবা। শিক্ষার্থীদের জন্য শুরু করা হয় বিশেষ ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। এখানে মেডিসিন, গাইনি এবং চর্মরোগসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। জগন্নাথ হল এবং শামসুননাহার হল থেকে শুরু হওয়া এই মেডিকেল ক্যাম্পগুলোকে নিয়মিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। তুরস্কের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা TİKA-র বিশেষ সহযোগিতায় মেডিকেল সেন্টারটিকে সম্পূর্ণ সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়। সেখানে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত এক্স-রে মেশিন এবং আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, এই আধুনিকায়িত মেডিকেল সেন্টার থেকে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী, দুই হাজার শিক্ষক এবং পাঁচ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সরাসরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।

চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষমতায়ন ও কল্যাণে ডাকসু নিয়ে আসে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা এবং ক্রীড়াচর্চার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি আধুনিক জিমনেসিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে পরিচিত আবাসন সংকটের সমাধানেও ডাকসু সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। নতুন হল নির্মাণ এবং বিকল্প আবাসনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে নিয়মিত সমন্বয় এবং সরেজমিনে কাজ করেছেন ডাকসু প্রতিনিধিরা। বিশেষ করে উত্তরা-দিয়াবাড়ী এলাকায় বিকল্প আবাসনের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেন ভিপি সাদিক কায়েম।

শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং পেশাদার দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ডাকসুর পদক্ষেপগুলো ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। গত ১৭ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিশাল চাকরি মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে চীনের ৩১টি নামী প্রতিষ্ঠানসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি অংশগ্রহণ করে। সংশ্লিষ্ট মহলের তথ্যমতে, এই মেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ৪৩০ জন শিক্ষার্থী সরাসরি চাকরির সুযোগ পান। শুধু তাৎক্ষণিক চাকরি নয়, বরং তরুণদের দীর্ঘমেয়াদী দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিল্পখাতের সাথে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে আয়োজন করা হয় ‘বাংলাদেশ স্কিলস সামিট ২০২৬’। এই সামিটের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ করে তোলা।

নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত উন্নয়নের বিষয়েও ডাকসু পিছিয়ে থাকেনি। পাঁচটি পৃথক ইউনিটে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সেলফ-ডিফেন্স বা আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি হলগুলোর পরিবেশ রক্ষায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশক নিধন এবং ছাড়পোকা নিয়ন্ত্রণের মতো প্রয়োজনীয় কর্মসূচি পরিচালনা করেন ডাকসুর সদস্যরা। পরিবহন ব্যবস্থায় আনা হয় আমূল পরিবর্তন। জরাজীর্ণ বাসগুলো পরিবর্তন এবং ট্রিপ সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় বাজেটের ব্যবস্থা করা হয়। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে সব রুটে সান্ধ্যকালীন বাস ট্রিপ চালু করা হয় এবং অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের জন্য ১৯টি আধুনিক ইলেকট্রিক শাটল বাস চালু করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে এই উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলোর ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে ডাকসুতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হওয়ার পর থেকে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান, শিক্ষা ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ইতিবাচক পদক্ষেপে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের সন্তুষ্টির সুর শোনা যাচ্ছে। ডাকসুর দীর্ঘ পথচলায় ইতিহাসের পুরোনো নামের ভিড়ে এখন নতুন প্রজন্মের আলোচনায় উঠে আসছে এই বর্তমান নেতৃত্ব। মাওলানা গোলাম আযম থেকে শুরু করে আমানুল্লাহ আমান কিংবা মাহমুদুর রহমানের মতো পূর্বসূরিদের ঐতিহ্যের সাথে সাদিক কায়েমের এই তরুণ নেতৃত্বের কার্যকারিতা নানাভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। এক বছরের এই যাত্রায় ডাকসু প্রমাণ করেছে যে, সঠিক নেতৃত্ব এবং পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব।