জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন মিল্লাদ হোসেন। শরীর থেকে গুলির চিহ্ন মুছে গেলেও মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা কলেজ শাখার সদস্য সচিব এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক সাহসী যোদ্ধা মিল্লাদ হোসেনের জীবন এখন সেই যন্ত্রণারই এক জীবন্ত দলিল। শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ আহতদের পরিবারের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি তাঁর জীবনের এই করুণ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই সম্মেলনে তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

বক্তব্যের শুরুতেই মিল্লাদ হোসেন অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান, তাঁর শরীরের ক্ষতগুলো এখনো তাকে কষ্ট দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি এখনো স্বাভাবিকভাবে হাত তুলতে পারি না। রাতে শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ পাই না, আর ঘুম থেকে উঠলে আহত হাতটি ফুলে যায়।” ১৯ জুলাই পল্টনে বিএনপির একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে তিনি পুলিশের গুলিতে আহত হন। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে যখন তারা প্রেস ক্লাবের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখনই পুলিশ অতর্কিতে গুলি চালায়। সেই নির্মম গুলিতে মিল্লাদের বাম বাহু শরীর ভেদ করে চলে যায়। শুধু তিনি নন, তাঁর পাশেই থাকা যুবদলের কর্মী নবীন তালুকদার মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। ওই একই স্থানে আরও একজন ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চিকিৎসা পাওয়ার লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে মিল্লাদ অভিযোগ করেন, আহত হওয়ার পর তাঁকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করা হয়নি। পরবর্তীতে যখন তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন পুলিশ অ্যাম্বুলেন্স আটকে দিয়ে তাঁর চিকিৎসায় বাধা সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত কাকরাইলের একটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তপাত সাময়িকভাবে বন্ধ করা সম্ভব হলেও তিনি পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক চিকিৎসা পাননি। ছাত্রদলের এই নেতা আরও জানান, ২৬ জুলাই রাতে পুলিশি অভিযানের চরম আতঙ্কে হাসপাতালের আহতদের সেখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। পরবর্তীতে অন্য হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করার সময় বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিককে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরুর আগেই গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। ফলে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকেন।

শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি পারিবারিক শোকের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মিল্লাদ জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ভুল তথ্যের কারণে তাঁর পরিবার জানতে পেরেছিল যে তিনি মারা গেছেন। এই দুঃসংবাদ শুনে তাঁর বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এরপর আর পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। গত বছরের ১২ মে তাঁর বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বক্তব্যে বাবার স্মৃতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি জানান, তাঁর বাবার মৃত্যুর পেছনে এই ঘটনার গভীর প্রভাব ছিল।

সম্মেলনের শেষে মিল্লাদ হোসেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি, উন্নত চিকিৎসা সেবা এবং যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান। নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থার প্রমাণ হিসেবে তিনি গুলিবিদ্ধ অবস্থার ছবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রদর্শন করেন।

উল্লেখ্য, এই জাতীয় সম্মেলনের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি এবং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।