যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত সুপরিচিত ইহুদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইম্যানুয়েল কলেজ চলতি বছরের শেষ নাগাদ তাদের সমস্ত কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা ও সামাজিক সেবার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল লেভি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং বেদনাদায়ক। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখে এই পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।
১৯৯০ সালে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের সাবেক প্রধান রাব্বি ইম্যানুয়েল জ্যাকোবোভিটসের হাত ধরে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি ইহুদি সম্প্রদায়ের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষার এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। বর্তমানে এখানে ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রায় ৩৬০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তবে আর্থিক সংকটের কালো মেঘ অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে ধরেছিল, যার ফলে গত বছরই স্কুলটির প্রাথমিক শাখাটি বন্ধ করে দিতে হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৫ সালে 'দ্য সানডে টাইমস'-এর প্যারেন্ট পাওয়ার গাইডে এটি দেশের সেরা পারফর্মিং ইহুদি স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। কিন্তু কেবল একাডেমিক সাফল্যই একটি প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়, যখন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে তা সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
স্কুল কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ভ্যাট আরোপ, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে প্রতিষ্ঠানটি চরম আর্থিক চাপে পড়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থী সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাওয়ায় প্রতি বছর ২০ লাখ পাউন্ডের বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছিল স্কুল কর্তৃপক্ষকে। এই সংকটময় পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের আইনপ্রণেতা অলিভার ডাউডেন মন্তব্য করেছেন যে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত ভ্যাটের নেতিবাচক প্রভাবের এক বাস্তব উদাহরণ ইম্যানুয়েল কলেজের এই করুণ পরিণতি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইহুদি শিক্ষাব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মধ্যেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে অনেক অভিভাবক ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকারিভাবে পরিচালিত বিনামূল্যে ইহুদি স্কুলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। এই প্রবণতা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং তাদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যরা এই সিদ্ধান্তে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমাপ্তি নয়, বরং একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সংহতির এক যুগের অবসান, যা আগামী প্রজন্মের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।











