জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক চূড়ান্ত পরিণতি। বুধবার দুপুরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের আয়োজিত ‘মননে জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
বক্তব্যের শুরুতেই জাহেদ উর রহমান উল্লেখ করেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বিভিন্ন মহলে যে বিতর্ক ও বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। তিনি বলেন, যেকোনো বড় গণআন্দোলনের পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের বিতর্ক, মতপার্থক্য কিংবা হতাশা তৈরি হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত প্রত্যাশার মোহ ত্যাগ করে বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি আহ্বান জানান, একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সব পক্ষকে একসাথে নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে তুলনা করে উপদেষ্টা বলেন, আরব বসন্ত-পরবর্তী পরিস্থিতির তুলনায় বাংলাদেশ বর্তমানে অনেক শ্রেয় অবস্থানে রয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর চরম বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশে তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তার মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধের ফসল। বিরোধী রাজনৈতিক দল, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন, মানবাধিকারকর্মী এবং সাধারণ মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফলেই এই স্বৈরাচারের পতন সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা আরও বলেন, বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য মানুষ মামলা, কারাবাস, গুম, অমানবিক নির্যাতন, সম্পত্তি দখল এবং জীবিকা হারানোর মতো চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন। এই অদম্য ত্যাগ এবং প্রতিরোধই ধীরে ধীরে স্বৈরাচারী শাসনকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং আত্মত্যাগই মূলত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। পরবর্তীতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা সামনে এলেও, সবার অভিন্ন দাবি ছিল স্বৈরশাসনের অবসান এবং জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জুলাইয়ের এই চেতনাকে ধারণ করে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে ভবিষ্যতে আর কখনোই কোনো স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদারিপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কেবল রাজনীতিবিদরা নন, বরং সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে গুম করে পুরো বাংলাদেশকে একপ্রকার জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। তবে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সেই ভয়ংকর গুমের রাজনীতির অবসান ঘটেছে।
একই সাথে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, শেখ হাসিনা কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে নয়, বরং পুরো বাংলাদেশকেই গুম করে রেখেছিলেন। পেশাজীবী থেকে শুরু করে সাংবাদিক—কেউই তার হাত থেকে রেহাই পাননি। দেশকে জিম্মি করে রাখার জন্য প্রতিটি শ্রেণির মানুষকে চাপের মুখে রাখা হয়েছিল। জুলাই আন্দোলন ছিল সেই দুঃস্বপ্নের গল্পের এক চূড়ান্ত সমাপ্তি।
ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহ নিসতার জাহান কবিরের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিনা শরমীন। এছাড়া অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত থেকে আলোচনা ও মতবিনিময় করেন।

















