রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডের সি-২৬ নম্বর সরকারি ডি-শ্রেণির একটি কোয়ার্টার অবৈধভাবে দখল করে রাখা এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পদায়নের ঘটনায় ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তা মো. সোলায়মান। তার বিরুদ্ধে সরকারি আবাসন বিধিমালা চরমভাবে লঙ্ঘন করে বরাদ্দ বাতিলের পরও সরকারি বাসা ছাড়তে অস্বীকার করার পাশাপাশি, প্রচলিত নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদায়নের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে মো. সোলায়মানকে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়। সরকারি আবাসন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বদলি হলে তাকে সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে সরকারি বাসা ছেড়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। তবে অভিযোগ রয়েছে যে, সোলায়মান এই নিয়ম মেনে চলেননি এবং বদলি হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে বাসাটি দখল করে রাখেন। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি সরকারি আবাসন পরিদপ্তর তার নামে ওই বাসার বরাদ্দ বাতিল করে এবং একই কোয়ার্টার অন্য এক কর্মকর্তার নামে পুনরায় বরাদ্দ প্রদান করে।

নতুন বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গত ২৮ জানুয়ারি বাসাটি বুঝে নেওয়ার জন্য যথাযথ আবেদন জানালেও, মো. সোলায়মান কোয়ার্টারটি দখলমুক্ত না করায় তিনি তা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন। সরকারি বাসায় এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় পরবর্তীতে ৫ এপ্রিল সরকারি আবাসন পরিদপ্তর কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে বাসাটির পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে ১৫ এপ্রিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস এবং ডিপিডিসির কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পৃথক চিঠি পাঠায়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মো. সোলায়মান দাবি করেন, তার নোয়াখালীতে পোস্টিং হওয়ার কারণে আবাসনের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তাকে পুনরায় ঢাকায় পদায়ন করা হয়েছে, ফলে বিষয়টি এখন আর আগের অবস্থায় নেই। তিনি আরও জানান, তার বরাদ্দ যাতে বাতিল না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট আবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে ইতিমধ্যে জমা দিয়েছেন।

সরকারি আবাসন সংক্রান্ত বিতর্কের পাশাপাশি মো. সোলায়মানের নিটোরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর মো. সোলায়মানকে গত ২৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একই পদে নিটোরে পদায়ন করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর স্বাক্ষরে এই অফিস আদেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে গত ৬ মে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখা থেকে নতুন অফিস আদেশ জারি করে তাকে নিটোরে 'প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নিজ বেতনে)' হিসেবে পদায়ন করা হয়। ওই আদেশে স্বাক্ষর করেন প্রশাসন-১ শাখার উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, মাঠপর্যায়ের ষষ্ঠ গ্রেড থেকে নিম্নপদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। কিন্তু এই ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় সরাসরি অফিস আদেশ জারি করে প্রচলিত প্রশাসনিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে নিয়োগবিধি অনুযায়ী একজন কম্পিউটার অপারেটরকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদায়নের কোনো আইনি সুযোগ নেই। বিশেষ ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হলেও প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। তাদের মতে, মো. সোলায়মানের এই পদায়নের মাধ্যমে সরকারি নিয়োগবিধি ও প্রশাসনিক শিষ্টাচার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।

কম্পিউটার অপারেটর থেকে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন এবং মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. সোলায়মান বলেন, "এটা তেমন কোনো সমস্যা নয়। সরকার যাকে ইচ্ছা, তাকে যেকোনো স্থানে পদায়ন করতে পারে। এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বিষয়। তবে বিষয়টি যদি আপনার কাছে সমস্যা মনে হয়, তাহলে এ বিষয়ে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।"

পুরো বিষয়টি নিয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মো. আবুল কেনান জানান, "এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে যদি যথাযথভাবে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"