জাজিরায় পিআইওর বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ; ব্যবস্থা নিতে গড়িমসিতে ক্ষোভ

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং সংবাদকর্মীকে প্রভাবিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ইস্রাফিলের বিরুদ্ধে। তবে এসব গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পরও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই নিষ্ক্রিয়তার ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে যে, জাজিরা উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ 'ম্যানেজ মানি'র নামে হাতিয়ে নেওয়া হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মোট বরাদ্দের প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ অর্থ কমিশন হিসেবে কেটে রাখা হতো। শুধু তাই নয়, জনস্বার্থে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ আত্মসাতের লক্ষ্যে বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প তৈরি এবং কাজে চরম অনিয়ম করার অভিযোগও রয়েছে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব অনিয়মের বিষয়ে তিনি নিজেই বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

ঘটনার মোড় ঘোরে গত ৬ জুলাই, যখন দৈনিক ইত্তেফাক ডিজিটালে এই অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর অভিযুক্ত পিআইও ইস্রাফিল সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করেন। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাতের প্রস্তাব দেন এবং মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসা করার চেষ্টা করেন। তবে প্রতিবেদকের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।

স্থানীয় ও দাপ্তরিক একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রতিবেদককে প্রভাবিত করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তা এখন প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় নিজের পদে বহাল থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের পছন্দের কর্মস্থল হিসেবে কেরানীগঞ্জে বদলির চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে। এদিকে, পিআইওর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বাশার নামে এক ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বাশার এখনও নিয়মিতভাবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাতায়াত করছেন এবং দাপ্তরিক কাজে প্রভাব খাটছেন। এতে করে অনিয়মের তথ্য দিয়ে যারা সহযোগিতা করেছেন—যেমন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য এবং দপ্তরের কিছু সাহসী কর্মকর্তা-কর্মচারী—তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, অভিযোগের পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভবিষ্যতে কেউ অনিয়মের তথ্য দিতে সাহসী হবেন না।

এই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল-ইমরান জানান, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা চাইলে এই বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। প্রয়োজনে তিনি তদন্ত কাজে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন অথবা তদন্তের দায়িত্ব পালন করবেন। তবে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে তাকে উচ্চপর্যায় থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, শরীয়তপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শামিমা নাজনীন বলেন, তিনি একবার সরেজমিনে গিয়ে প্রকল্পগুলোর কাজ পরিদর্শন করেছেন। তার দাবি, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করেছেন, তারা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও প্রমাণ পাঠিয়েছেন, কিন্তু সেগুলো এখন পর্যন্ত দেখা হয়নি বা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাহসিনা বেগম জানান, অভিযোগের বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং তিনি জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ও জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, এর আগে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ আসলাম বিষয়টি তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি নিজে সরেজমিনে প্রকল্প পরিদর্শন করেন এবং কিছু নিম্নমানের কাজ পুনরায় সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে পিআইওর বিরুদ্ধে ওঠা সাম্প্রতিক এই গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।