পঞ্চগড়ে মহারাজার দিঘী থেকে উদ্ধার হওয়া ১৯ বছর বয়সী তরুণের রহস্যজনক মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে বোনের প্রতিশোধের এক লোমহর্ষক গল্প। নিজের বোনকে একাধিকবার ধর্ষণের জেরে ভাড়াটে খুনি দিয়ে ছোট ভাইকে হত্যা করেছেন বড় বোন সমলা আক্তার। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সমলা আক্তার (২৪) এবং তার সহযোগী শাহাবুদ্দিন (৪৬)-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ পেয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) ফরহাদ হোসেন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, গত বুধবার দুপুরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের মহারাজা দিঘী থেকে মানিক হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মানিক উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের মালাদাম এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের সময় তার কোমরে একটি চিরকুট পাওয়া যায়, যেখানে তার মৃত্যুর জন্য নির্দিষ্ট কয়েকজনকে দায়ী করা হয়েছিল। পুলিশ মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এদিকে, নিহতের বড় ভাই মালেক হোসেন বুধবার (১৫ জুলাই) পঞ্চগড় সদর থানায় অজ্ঞাতনামিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শুরু করে পুলিশ নিহতের বোনের কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে একটি ক্যালেন্ডারের পাতা খুঁজে পায়, যার হাতের লেখা মরদেহের সাথে পাওয়া চিরকুটের সাথে হুবহু মিলে যায়। এই সূত্র ধরে পুলিশ মানিকের মা মালেকা বেগম এবং বোন সমলাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সমলা তার অপরাধ স্বীকার করেন। তবে তদন্তে মায়ের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সমলা জানান, তিনি তিনবার বিয়ে করলেও বাবার বাড়িতেই বসবাস করতেন। তার দাবি, প্রায় তিন মাস আগে তার ছোট ভাই মানিক তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এবং গোপনে ভিডিও ধারণ করে। এরপর সেই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে মানিক তাকে বারবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করে। এই নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতেই সমলা এক ভয়াবহ পরিকল্পনা করেন। গত ১২ জুলাই প্রতিবেশীদের সাথে তার ঝগড়া হলে, তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে মানিককে হত্যা করে তার দোষ প্রতিবেশীদের ওপর চাপিয়ে দেবেন। এই পরিকল্পনায় সহযোগী হিসেবে তিনি প্রতিবেশি শাহাবুদ্দিনকে নিয়োগ করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই সন্ধ্যায় সমলা মানিককে নিয়ে মহারাজার দিঘীর এলাকায় ঘুরতে যান। সেখানে একটি বাড়িতে মানিক তাকে আবারও শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করে। এরপর রাত ৮টার দিকে পাশের একটি হোটেলে মানিককে পানির সাথে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান সমলা। রাত ১০টার দিকে মানিক যখন ঘুমের ঘোরে অচেতন হয়ে পড়েন, তখন তাকে দিঘীর পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সমলা মানিকের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে পানিতে ফেলে দেন এবং আত্মহত্যার নাটক সাজাতে কোমরে ওই চিরকুটটি রেখে সটকে পড়েন। এরপর সহযোগী শাহাবুদ্দিন মানিককে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মরদেহটি দিঘির পানিতে ফেলে দেয়। রাত একটার দিকে তারা দুজনেই বাড়ি ফিরে যান।
পরবর্তীতে বুধবার দুপুরে দিঘী থেকে মানিকের মরদেহ উদ্ধার হয়। স্বীকারোক্তির পর পুলিশ অভিযুক্ত সমলা ও শাহাবুদ্দিনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।











