চুলকালে আরাম লাগে ঠিকই, তবে তা ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর: বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণা

মশার কামড় কিংবা ত্বকের অ্যালার্জি—এই ধরণের সমস্যা হলে আমরা অনেকেই সহজাতভাবেই আক্রান্ত স্থানটি চুলকাতে শুরু করি। চুলকালে সাময়িক এক অদ্ভুত আরাম পাওয়া যায়, তবে বড়দের সতর্কবার্তা থাকে, ‘বেশি চুলকালে অবস্থা আরও খারাপ হবে।’ কিন্তু কেন এমন হয়? যে কাজটি করলে এত আরাম লাগে, তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয় কীভাবে? এই রহস্য উদঘাটন করতে সম্প্রতি এক চমকপ্রদ গবেষণা চালিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের প্রখ্যাত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর ড্যানিয়েল কাপলান এবং তার গবেষক দল ইঁদুরের ওপর একটি বিশেষ পরীক্ষা চালান। গবেষণার জন্য ইঁদুরগুলোর গলায় বিশেষ শঙ্কু আকৃতির কলার পরানো হয়েছিল, যাতে তারা নিজেদের শরীর চুলকাতে না পারে। ইঁদুরের কানের ত্বকের ওপর এই পরীক্ষাটি চালানো হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যে ইঁদুরগুলো স্বাভাবিকভাবে চুলকাতে পেরেছিল, তাদের ত্বকের আক্রান্ত স্থানে প্রদাহ সৃষ্টিকারী রোগপ্রতিরোধক কোষ জমা হয়েছে এবং ফোলা ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে, যেসব ইঁদুরের গলায় কলার পরানোর কারণে চুলকানোর সুযোগ ছিল না, তাদের ত্বকে ফোলা ভাব এবং ক্ষতের পরিমাণ ছিল অনেক কম।

ডক্টর কাপলান ব্যাখ্যা করেন, মশার কামড়ের পর আমরা যদি ধৈর্য ধরে তা উপেক্ষা করি, তবে সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই সেই চুলকানি চলে যায়। কিন্তু একবার যদি চুলকানো শুরু করি, তবে সেই অস্বস্তি এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের ত্বকে ‘মাস্ট সেল’ নামক এক ধরনের বিশেষ সুরক্ষাকারী কোষ থাকে। যখন কোনো পতঙ্গ কামড়ায় বা অ্যালার্জি হয়, তখন এই মাস্ট সেল থেকে ‘হিস্টামিন’ নামক এক রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়, যার ফলে আমরা চুলকানি অনুভব করি।

সাধারণত মানুষ ততক্ষণ চুলকায় যতক্ষণ না সেখানে ব্যথা অনুভূত হয়। এই ব্যথার ফলে আমাদের স্নায়ুকোষ থেকে ‘সাবস্ট্যান্স পি’ নামক এক ধরণের রাসায়নিক নির্গত হয়। এই রাসায়নিকটি পুনরায় মাস্ট সেলগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় করে তোলে। ফলে হিস্টামিনের নিঃসরণ বেড়ে যায় এবং ত্বকের ফোলা ভাব ও চুলকানি আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এভাবেই তৈরি হয় একটি অন্তহীন ‘চুলকানি চক্র’।

তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, চুলকালে আরাম লাগে কেন? গবেষকরা এর পেছনে বিবর্তনীয় কারণ খুঁজে পেয়েছেন। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বা প্রাণীরা শরীর থেকে উকুনের মতো পরজীবী তাড়ানোর জন্য চুলকানোর অভ্যাস গড়ে তুলেছে। এছাড়া দেখা গেছে, চুলকানির ফলে সৃষ্ট বাড়তি প্রদাহ ত্বককে ‘স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস’ নামক সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে কিছুটা সাহায্য করে। তবে এই সামান্য উপকারের তুলনায় চুলকানোর ক্ষতিকর দিকগুলো অনেক বেশি।

ডক্টর কাপলান জোর দিয়ে বলেছেন, দিনশেষে চুলকানো ত্বকের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, তাই এটি এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন মশার কামড় বা অ্যালার্জির সমস্যা কমাতে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরনের ক্রিম বা লোশনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ডক্টর কাপলান একটি কার্যকর উপায়ের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মেন্থলযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করলে ত্বক সাময়িকভাবে চুলকানির বদলে শীতল অনুভূতি পায়। এর ফলে মস্তিষ্ক চুলকানোর সংকেত পাওয়া কমিয়ে দেয় এবং সহজেই ওই ক্ষতিকর চক্রটি ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়।

সূত্র: এপি