বান্দরবানের দুর্গম পাহাড় ও বনাঞ্চলের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখতে এক অনন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এক শিক্ষক। সেই সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ করা হবে বলে জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। রোববার (২৮ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।

সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় শিক্ষামন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই স্কুলটির জাতীয়করণের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর অফিস থেকে শিক্ষামন্ত্রীকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যেখানে তিন্দু এলাকার এই বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রধান শিক্ষকের অদম্য সংগ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তায় লিখেছিলেন, বান্দরবানের দুর্গম থানচির তিন্দু এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এক ব্যতিক্রমী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তারা নিয়মিত বেতন দিতে পারে না, যার ফলে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

এই চরম সংকট মোকাবিলায় প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, স্কুলটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রধান শিক্ষক নিজেই থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী নদীপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেন। এভাবে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি ৪০ হাজার টাকা আয় করেছিলেন, যার মধ্যে ৩০ হাজার টাকা সহকর্মীদের বেতন হিসেবে প্রদান করেন। একজন শিক্ষকের এমন ত্যাগ ও নিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখেছেন এবং স্কুলটি জাতীয়করণের আবেদন তাঁর কাছে পাঠিয়েছেন।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সেই লক্ষ্যেই এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। তিনি দাবি করেন, এর আগে কখনোই শিক্ষা খাতে এমন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতে জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ বরাদ্দ থাকলেও তা ছিল মূলত ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। কারণ, সেই বরাদ্দের একটি বড় অংশ আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। এবার শিক্ষা খাতে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এই বরাদ্দের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বণ্টন করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ১০৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এই বরাদ্দের মাধ্যমেই দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়ের সংকট দূর করা সম্ভব ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করায় এই সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে।

শিক্ষা খাতের আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ফ্রি ওয়াইফাই এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক এডুকেশন আইডি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার ব্যাপক পরিকল্পনা চলছে। শিক্ষকদের হাতে ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কার্যকারিতা বাড়বে এবং শিক্ষকরা পাঠদান থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের যাবতীয় তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতে পারবেন।

শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা ‘আনন্দের সাথে শেখা’ কর্মসূচির কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। এটি প্রধানমন্ত্রীর একটি বিশেষ ভাবনা। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু বই-খাতার চাপ থেকে বের করে এনে আনন্দের সাথে শেখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং এই লক্ষ্যে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ধাপে ধাপে আরও ২০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈষম্য নিরসনে ৫০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (GIS) ম্যাপিং করা হয়েছে এবং ১৫ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই দেওয়ার কথা জানান তিনি।

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক এডুকেশন আইডি চালুর বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, উন্নত দেশগুলোর মতো জন্মের পর থেকেই যদি জাতীয় পরিচয়ভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা থাকত, তবে স্কুল পর্যায়ে আলাদা আইডির প্রয়োজন হতো না। উন্নত বিশ্বে যেভাবে সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর থাকে, বাংলাদেশেও তেমন ব্যবস্থা থাকলে এই নতুন আইডির প্রয়োজনীয়তা থাকত না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পরিবেশ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সারা বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে সরকার কাজ করছে। সোমবার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘স্টার্টআপ ইনোভেশন শোকেস’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রতিভা প্রদর্শিত হবে। এছাড়া বিতর্ক প্রতিযোগিতা, অলিম্পিয়াড, স্কাউট, বিএনসিসি এবং গার্ল গাইডের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। আগামী বছর থেকে সারাদেশে ২৪ হাজার বিএনসিসি সদস্য তৈরির প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।

মানবসম্পদকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে কারিগরি শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই টেকনিক্যাল, প্রফেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী লন্ডন সফরের সময় লক্ষ্য করেছিলেন যে সেখানকার শিশুরা সুন্দর পোশাক পরে স্কুলে যায়। সেই স্বপ্ন থেকেই বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর জন্য জুতা, মোজা, শার্ট, প্যান্ট, স্কুল ড্রেস এবং ব্যাগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যা আগামী অর্থবছর নাগাদ সারা দেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন সংকটের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী জানান, মে ও জুন মাসে মাদ্রাসা শিক্ষকরা বেতন পাননি। বিগত সরকার এনটিআরসি-র মাধ্যমে প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিলেও তাদের বেতনের জন্য প্রয়োজনীয় মাসিক ৫০১ কোটি টাকার ব্যবস্থা করেনি। তবে অর্থমন্ত্রী দ্রুত ১০০ কোটি টাকার ব্যবস্থা করেছেন এবং জুলাই মাসের মধ্যে বাকি টাকা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছেন। সবশেষে শিক্ষকদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর ভাতার কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০২২ সাল থেকে অবসরে যাওয়া শিক্ষকরা এখনো তাদের পাওনা পাননি। তবে বাজেটে এই বরাদ্দের ব্যবস্থা করায় তিনি অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান এবং দ্রুত পাওনা পরিশোধের কথা জানান।