বাংলাদেশে কোনো ধরনের চরমপন্থা ও উগ্রবাদের ঠাঁই হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, দেশের মহান শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধারা এমন এক স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে চরমপন্থার কোনো স্থান থাকবে না এবং চূড়ান্ত কথা হবে কেবল ন্যায়পরায়ণতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে আর কাউকে জনগণের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। তার দীর্ঘ ও বিস্তারিত বক্তব্যে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠনে সরকারের গৃহীত নানা যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা এবং কুইক রেন্টাল চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার দেশপ্রেমের পরিবর্তে নিজেদের পকেট ভারী করার নেশায় অন্ধ ছিল এবং বিদ্যুৎ খাতকে দুর্নীতির এক বিশাল আখড়ায় পরিণত করেছিল।

গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সংসদীয় চর্চার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি বিল উপস্থাপনকে কেন্দ্র করে আমাদের মধ্যে মতভেদ বা দ্বিমত থাকতে পারে, এবং সেটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই অধিবেশনে আমরা দেখেছি অত্যন্ত প্রাণবন্ত আলোচনা। বিরোধী দল এবং সরকারি দল—উভয় পক্ষই তাদের নিজস্ব চিন্তা ও যুক্তি উপস্থাপন করতে পেরেছে। এই সংসদ প্রকৃতপক্ষে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং সত্যিকারের জনগণের সংসদ হয়ে উঠেছে।’

বিগত বছরগুলোর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার অঙ্গীকার জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উভয় পক্ষই একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, বিগত ১৭ বছরের দুঃশাসন এবং সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লবের সময়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পাশে আমরা সব ধরনের অর্থনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়াব।’ জাতীয় সংসদে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘৩১ দফা এখন আর কেবল বিএনপির নিজস্ব কোনো দাবি নয়, বরং এটি এখন সমগ্র দেশের দাবি এবং জাতীয় সংকল্পে পরিণত হয়েছে। জুলাই সনদের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এবং এই দায় আমরা যথাযথভাবে পালন করব।’

দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ঋণনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে বিনিয়োগনির্ভর করার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ২০৩৪ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে চাই।’ তিনি কেবল জনশক্তি রফতানির ওপর নির্ভর না করে দেশে ইকো-টুরিজম, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং ব্লু-ইকোনমি বা সামুদ্রিক অর্থনীতি খাতের সর্বোচ্চ ব্যবহারের কথা বলেন। এই খাতগুলোতে মোট ১০ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রতিবছর ৫ কোটি করে মোট ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে চারা উৎপাদনের জন্য দেশজুড়ে ১০ হাজার নতুন নার্সারি গড়ে তোলা হবে, যার ফলে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের জন্য চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং আধুনিক ক্যারিয়ার সেন্টার তৈরির কাজ দ্রুত গতিতে চলছে বলেও তিনি জানান।

বিগত সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষাকে অটো প্রমোশন এবং নকলের সংস্কৃতি দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদ অত্যন্ত সুকৌশলে এই কাজটি করেছে যাতে মেধাশূন্য প্রজন্ম তৈরি হয়। আমরা এখন বিতর্কিত বিষয়গুলো সিলেবাস থেকে সরিয়ে এনে শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মানসম্মত শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আগামী বাজেটে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

দেশের স্বাস্থ্য খাতের করুণ দশা বর্ণনা করতে গিয়ে তারেক রহমান একে ‘১০১ ভাগ অসুস্থ’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারী সরকার এ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে অন্য দেশের হাতে তুলে দিয়েছিল। আমরা স্বাস্থ্য খাতের বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। কেবল চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধের ওপর বেশি জোর দিতে দেশজুড়ে এক লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঁচটি বিভাগে ২০০ শয্যার পাঁচটি আধুনিক শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে বলে তিনি জানান।

দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই নজিরবিহীন দুর্নীতিকে আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। অপরাধীদের হাত বেঁধে হোক কিংবা টুঁটি চেপে ধরে হোক—পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার বদ্ধপরিকর।’ তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনীতে রূপান্তর করা হবে। এরইমধ্যে ১০ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় রোধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি পরিচ্ছন্ন ও আদর্শ বাংলাদেশ গড়তে দেশের ৩০০ সংসদ সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় নেতৃত্ব দিতে হবে এবং দায়িত্ব নিতে হবে; তবেই প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব। সংসদ অধিবেশন চলাকালীন নিরলস পরিশ্রম করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান যেন তাদের এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অগ্রিম ভাতা প্রদান করা হয়।

সবশেষে সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই যেন তা শত্রুতায় রূপ না নেয়। বাংলাদেশে আর যাতে কখনও ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিতে না পারে এবং দেশ যাতে কখনও কোনো বিদেশি শক্তির তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত না হয়—এই প্রশ্নে আমাদের সবার মধ্যে একটি অটুট জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।’