‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে আপামর জনগণের ক্ষোভের এক তীব্র বিস্ফোরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এই লড়াই ছিল সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের এক চূড়ান্ত সংগ্রাম।

তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন ১৬ জুলাই রংপুরের আবু সাঈদের কথা। রাষ্ট্রপতির ভাষণে উঠে এসেছে আবু সাঈদের সেই প্রসারিত হাত এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদতবরণের করুণ ও সাহসী দৃশ্য, যা পুরো দেশের ছাত্র-জনতাকে আন্দোলিত করেছিল। একই দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও বেশ কয়েকজন তরুণের আত্মাহুতি এই আন্দোলনকে এক নতুন মোড় দেয় এবং এর মাত্রাকে করে তোলে আরও তীব্র। এরপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আটক ও জেল-জুলুমের প্রতিবাদে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসেন। এই সম্মিলিত প্রতিরোধ ও সুতীব্র আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় ঐতিহাসিক গণ‌অভ্যুত্থান।

রাষ্ট্রপতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সেই সব সাহসী তরুণ-তরুণী ও যুবপ্রজন্মকে, যারা এই আন্দোলনে আহত হয়েছেন। তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, অনেকের পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে এবং তারা আজও যন্ত্রণাময় জীবনযাপন করছেন। একইসঙ্গে শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, আপনজন হারানোর গভীর শোক বুকে ধারণ করেও তারা যে অসীম ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তা অতুলনীয়। জুলাই যোদ্ধা এবং গণ‌অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকের ত্যাগ ও অবদানকে তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

রাষ্ট্রপতি স্পষ্টভাবে জানান, এই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়। বরং এটি ছিল গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা, অদম্য সাহস ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ফসল। তিনি মনে করিয়ে দেন, জুলাই শহীদদের আত্মদান আমাদের এই সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রের শক্তির প্রকৃত উৎস এবং সর্বময় ক্ষমতার মালিক একমাত্র জনগণ। জনগণের মৌলিক অধিকার, স্বার্থ, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও প্রধান দায়িত্ব।

জুলাইয়ের চেতনা আমাদের একটি মানবিক, স্বৈরাচারমুক্ত, সমতাভিত্তিক এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রেরণা জোগায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান-স্বীকৃতি প্রদান, তাদের পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং আহতদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ।

সরকার এই লক্ষ্যে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কেবল সরকারের পক্ষে সব করা সম্ভব নয়; তাই তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। সবশেষে তিনি বলেন, আসুন আমরা দল-মত-পথ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি, যাতে শহীদদের স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়—যা হবে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং ইনসাফভিত্তিক একটি সৌহার্দপূর্ণ রাষ্ট্র।