জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক–২০২৬-এ ‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)’ হিসেবে ভূষিত হয়েছেন ঢাকার বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এবং সোনারগাঁ উপজেলার সাবেক ইউএনও ফারজানা রহমান। গত বুধবার (১৫ জুলাই) চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর হাতে এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা তুলে দেন।

সোনারগাঁ উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তার এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর নেওয়া ব্যতিক্রমী ও দূরদর্শী উদ্যোগগুলোর স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।

জানা গেছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ফারজানা রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি সমন্বিত এবং টেকসই উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে উপজেলার মোট ১১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি। এর ফলে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধি পায়।

শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডিজিটাল করার লক্ষ্যে তিনি ১৫টি বিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে ৪৫ জন শিক্ষার্থীকে মৌলিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। কেবল প্রশিক্ষণেই সীমাবদ্ধ না থেকে, বাস্তব অনুশীলনের সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।

শিক্ষার্থীদের কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, বরং তাদের যুক্তিবোধ, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রথম শ্রেণির প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ‘বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্ড’ চালু করা হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা লাভ করে।

সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা, ভূমিসেবা এবং সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করা হয়। এছাড়া কুইজ প্রতিযোগিতা, সেমিনার এবং বিভিন্ন সৃজনশীল সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক শিক্ষায় উৎসাহিত করা হয়।

আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যে শতভাগ স্কুল ইউনিফর্ম নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম, জুতা, স্কুল ব্যাগ, খাতা ও কলম বিতরণ করা হয়, যা নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে কাজ করে।

বিদ্যালয়গুলোর পরিবেশকে মনোরম ও শিক্ষাবান্ধব করতে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ডাস্টবিন সরবরাহ, শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার রাখা, ফুলের বাগান তৈরি এবং ফলজ গাছ রোপণের মাধ্যমে প্রতিটি বিদ্যালয়কে সবুজ ও সুন্দর করে তোলা হয়।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। অভিভাবকদের জন্য বিদ্যালয়ে ‘অভিভাবক ছায়াতল’ নির্মাণ, নিয়মিত ক্লাস্টারভিত্তিক বিদ্যালয় পরিদর্শন এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়া মাঠ ভরাট, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, গাইড ওয়াল এবং প্যালাসাইডিং স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত কাজ তাঁর নেতৃত্বে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।

খেলাধুলা ও শারীরিক উৎকর্ষের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ এবং ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য জার্সি প্রদান করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের মাঝে দলীয় সংহতি ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করে।