ধর্মতলায় শহীদ দিবস পালন করল প্রদেশ কংগ্রেস: সংবিধানে আঘাত ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক শুভঙ্কর সরকারের

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আজ একুশে জুলাই, মঙ্গলবার। ঠিক দুপুর সাড়ে বারোটায় কলকাতার ধর্মতলা শহীদ মিনারের সামনে এক আবেগঘন ও সংকল্পবদ্ধ পরিবেশের মধ্য দিয়ে শহীদ দিবস পালন করল পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ যুব কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের বিশেষ আহ্বানে আয়োজিত এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল একুশে জুলাইয়ের সেই ১৩ জন বীর শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা, যাঁরা লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই এক গম্ভীর ও শ্রদ্ধাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। মঞ্চে উপস্থিত কংগ্রেসের প্রবীণ ও বর্তমান নেতৃত্ব একে একে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে মাল্য অর্পণ করেন এবং তাঁদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানান। কেবল শ্রদ্ধা জানানোই নয়, আজকের এই দিনটিকে সামনে রেখে আগামী দিনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার শপথ নেন উপস্থিত সকল নেতাকর্মী। এই মঞ্চ থেকেই মূলত প্রতিবাদের নতুন এক পথচলার সূচনা করা হয়।

আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, প্রবীণ নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী, দীপা মুন্সি, প্রদীপ ভট্টাচার্য, ইমরান প্রতাপঘড়ি, পাওয়ান খেরা, প্রকাশ যোশী, আশুতোষ চ্যাটার্জি, প্রদীপ প্রসাদ, সুমন রায় চৌধুরী, ডি পি রায়, আম্বা প্রসাদ সহ দলের আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত সকল অতিথিবৃন্দকে উত্তরীয় পরিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয় এবং তাঁদের সম্মান জানানো হয়।

মঞ্চ থেকে কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শুভঙ্কর সরকার বলেন, "গতকালের প্রচণ্ড বর্ষণের ফলে মাঠের চারপাশ জলমগ্ন হয়ে রয়েছে, চারদিকে কাদা। এই প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও হাজার হাজার কর্মী যেভাবে এখানে উপস্থিত হয়ে সহযোগিতা করেছেন, তার জন্য আমরা তাঁদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আজকের এই জনসমাবেশ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কংগ্রেস মরে যায়নি; বরং সাধারণ মানুষ এবং কর্মীরা এখনও শক্তভাবে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।"

পাশাপাশি, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং সোনিয়া গান্ধী যেভাবে দেশের স্বার্থে লড়াই করে চলেছেন এবং কংগ্রেস কর্মীদের পাশে থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, তার জন্য দল ও কর্মীরা তাঁদের কাছে ঋণী।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী শক্তি সাধারণ মানুষের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষের রুজি-রোজগার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। শুভঙ্কর সরকার স্পষ্ট জানান, এই অন্যায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। তাঁর অভিযোগ, কেবল সাধারণ মানুষই নন, বরং দেশের পবিত্র সংবিধানকেও অবমাননা ও নষ্ট করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তাই এই মঞ্চ থেকেই সংবিধানে আঘাত ঠেকানো, পড়ুয়াদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, কার্ডের মাধ্যমে পুনর্বাসন আদায় করা এবং আকাশছোঁয়া গ্যাস, তেল ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি কমানোর জন্য লড়াইয়ের শপথ নেওয়া হয়। এছাড়াও, ১৯৯৩ সালে যুব কংগ্রেসের মিছিলে গুলি চালানোর ঘটনায় অভিযুক্ত মনিশ গুপ্তর ফাইল পুনরায় খোলার জোরালো দাবি জানানো হয় এই সমাবেশে।

রাজ্যের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার আসার সাথে সাথেই গুন্ডামির সংস্কৃতি শুরু হয়ে গিয়েছে। আজ আমাদের কর্মীদের রাস্তায় আটকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। এতে তেরোজন কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন, যাঁরা বর্তমানে পিজি হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু এই দমন-পীড়ন আমাদের দমাতে পারেনি। আজকের এই সমাবেশ প্রমাণ করেছে যে আমরা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং সোনিয়া গান্ধীর পাশে আছি। আগামী নির্বাচনে আমরা রাহুল গান্ধীকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই।"

সমাবেশের শেষে তিনি উপস্থিত সকলকে অনুরোধ করেন যেন কেউ এখনই চলে না যান। তিনি ঘোষণা করেন, এখান থেকে সকলে সম্মিলিতভাবে হাসপাতালে যাবেন এবং আহত কর্মীদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেন। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কর্মীদের সঙ্গে দেখা করার পরেই তাঁরা বাড়ি ফিরবেন। যারা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের উদ্দেশ্যে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় বসে সমস্ত কথা বদলে দিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষের রুজি-রোজগার বন্ধ করে দিয়েছেন, তাঁদের এই শাসন বেশিদিন টিকবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

প্রতিবেদন: সমরেশ রায় ও শম্পা দাস, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।