ঢাকার ইট-পাথরের ব্যস্ততা আর যান্ত্রিকতার মাঝে এক টুকরো সবুজ প্রশান্তি। তেজগাঁও এলাকার একটি সড়কের বিভাজক এখন কেবল কংক্রিটের দেয়াল নয়, বরং তা পরিণত হয়েছে এক অভিনব শহুরে খামারে। রাস্তার বিভাজক জুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে টাটকা সবুজ শাকসবজি। এই সৃজনশীল উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন এলাকার রিকশা গ্যারেজের মালিক, চায়ের দোকানদার এবং সিকিউরিটি গার্ডদের মতো সাধারণ মানুষ। তারা নিজেদের মধ্যে জায়গা ভাগ করে নিয়ে গড়ে তুলেছেন এই ছোটখাটো সবজি বাগান, যা শহরের ধূসরতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

এই সড়কে চলাচলকারী পথচারীরা হঠাৎ করেই খুঁজে পাচ্ছেন গ্রামীণ পরিবেশের এক স্নিগ্ধ পরশ। এখানে অত্যন্ত যত্নে চাষ করা হচ্ছে পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, ডাটা, কচু, কাঁচামরিচ, ঢ্যাঁড়স, পালং শাক, লাল শাক ও মাশকলাইসহ হরেক পদের সবজি। যান্ত্রিক শহরের মাঝে এমন দৃশ্য বিরল এবং মনমুগ্ধকর।

রাস্তার পাশে রিকশাচালকদের জন্য ভাতের হোটেল দিয়েছেন নিলুফা ইয়াসমিন। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে কৃষিকাজ করতে দেখে বড় হয়েছেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে থাকার সময় বাড়ির আঙিনায় নানা ফসল আবাদ করার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। বর্তমানে শহরে বসবাস করলেও গাছপালা লাগানোর সেই শখ তিনি কোনোভাবেই ছাড়তে পারেননি। গ্রামের প্রতি টান এবং শখের বশে রাস্তার ধারেই শুরু করেছেন সবজি চাষ। নিলুফা ইয়াসমিন জানান, এতে যেমন তার শখ মিটছে, তেমনি নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর আশেপাশের মানুষকেও তা বিনামূল্যে দিতে পারছেন। তবে এই সবুজের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম; প্রতিদিন সকাল-বিকেল দু’বেলা গাছে পানি দিতে হয়। তিনি ব্যস্ত থাকলে তার ছেলেও গাছের যত্ন নেয়।

রাস্তার আরেকটু সামনে গেলেই দেখা যায় সবুজ কচুক্ষেত। এই কচু লাগিয়েছেন পাশেই একটি কোম্পানির সিকিউরিটি গার্ড প্রশান্ত। তার বাড়ি খুলনা। কাজের অবসরে শখ করে তিনি এখানে কচু চাষ করেছেন। বাড়ি থেকে বীজ এনে লাগিয়েছেন এই বিশেষ জাতের কচু, যা রান্নার পর মুখে গলে যায় বলে অনেকের কাছেই বেশ জনপ্রিয়। কচুগুলো একটু বড় হলেই অনেকে তা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। প্রশান্ত জানান, গাছপালা ও চাষাবাদের প্রতি তার দীর্ঘদিনের গভীর অনুরাগ রয়েছে। এমনকি তিনি যে ভাড়া বাসায় থাকেন, সেখানেও নানা জাতের সবজি লাগিয়েছেন।

ফুটপাতে তাসলিমার চায়ের দোকান। তিনিও রাস্তার বিভাজকে সবজি চাষে আগ্রহী। ঋতুভেদে তিনি বিভিন্ন সবজি লাগান। বর্তমানে সেখানে লাল শাক, মিষ্টি কুমড়া, ঢ্যাঁড়স ও পেঁপেসহ আরও কিছু সবজি রয়েছে। গ্রামে বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করার অভিজ্ঞতা এখন তাকে শহরের রাস্তায় সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দই আলাদা বলে মনে করেন তিনি। তবে আগাছা পরিষ্কার এবং নিয়মিত পানি দেওয়ার পরিশ্রম তাকে করতে হয়, কারণ সঠিক যত্ন ছাড়া ভালো ফলন সম্ভব নয়।

ঢাকার যান্ত্রিক রাস্তার মাঝে এমন সবজি চাষ যেন এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর দৃশ্য। যাতায়াতের পথে এই সবুজায়ন পথচারীদের মনকে মুহূর্তের জন্য গ্রামীণ আবেশে ভরিয়ে দেয়, যা শহরের একঘেয়েমি দূর করে মনে প্রশান্তি এনে দেয়।