লালমনিরহাটে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি এক কর্মকর্তাকে চাঁদা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া এবং তা না দেওয়ায় তাকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। একইসাথে ওই কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং তার মা ও ছোট ভাইকে গৃহবন্দি করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগগুলো তুলে ধরেন সহকারী যুব উন্নয়ন অফিসার তাহেরুল ইসলাম। তিনি নিজের এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

আদিতমারী উপজেলার কমলাবাড়ি ইউনিয়নের চড়িতাবাড়ি গ্রামের আব্দুল লতিবের ছেলে তাহেরুল ইসলাম বর্তমানে কালীগঞ্জ উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তিনি তার বাড়ির সংলগ্ন এলাকায় খালার ২৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। এই জমি ক্রয়ের পরপরই প্রতিবেশী এবং কমলাবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক নুর আলম তার কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।

তাহেরুল জানান, চাঁদা দেওয়ার বিষয়ে তিনি রাজি না হওয়ায় নুর আলমের হুমকি ও হয়রানি শুরু হয়। নুর আলম প্রায়ই তার বাড়িতে চলে আসতেন এবং অফিস যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে তাকে ভয়ভীতি দেখাতেন। এলাকার চিহ্নিত চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত নুর আলম তাকে বিভিন্ন সময়ে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে গত ২৬ জুন, যখন নুর আলম তাকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে জানান যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুই লাখ টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। এই প্রাণঘাতী হুমকির মুখে বাধ্য হয়ে ওই রাতেই তাহেরুল তার পৈতৃক ভিটা ছেড়ে কর্মস্থল কালীগঞ্জে একটি ভাড়া বাসায় আত্মগোপন করতে বাধ্য হন।

তবে আত্মগোপনে থাকলেও তার বিপদ কাটেনি। গত ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় যখন তিনি তার বাবা-মায়ের খোঁজ নিতে বাড়ি যান, তখন চড়িতাবাড়ির মিরেচক এলাকায় নুর আলম ও তার সহযোগীরা তার পথরোধ করে। সেখানে তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে তার পা ভেঙে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত ২৬ আগস্ট নুর আলম এবং তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম তাহেরুলের খোঁজে তার বাড়িতে যান। এবার তারা আগের দাবিকৃত দুই লাখ টাকার সাথে সুদ যোগ করে মোট আড়াই লাখ টাকা দাবি করেন। তাহেরুলকে সেখানে না পেয়ে তারা তার বৃদ্ধ বাবাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করেন এবং তাকে মারপিট করে গুরুতর জখম করেন।

এই চরম সংকটের মুহূর্তে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতিতে তাহেরুলের বোন তার রক্তাক্ত বাবাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেও বাধা হয়ে দাঁড়ান নুর আলম ও রফিকুল। তারা তার বোন এবং মাত্র ছয় মাস বয়সী ভাগ্নাকেও নির্মমভাবে মারধর করেন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য এসে তাদের উদ্ধার করে আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

তাহেরুল ইসলাম ক্ষোভের সাথে জানান, এসব ঘটনার বিষয়ে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুফল পাননি। বরং অভিযোগ জানানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে তার মা ও ছোট ভাইকে ওই চাঁদাবাজরা গৃহবন্দি করে রেখেছে। নুর আলম, রফিকুল এবং তাদের সহযোগীরা বাড়ির আশেপাশে অবস্থান নিয়ে পুরো পরিবারকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তাদের ভয়ে তিনি এবং তার পরিবার এখন জীবন নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ওই প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত। তাদের দুই ভাই বিএনপি নেতা, একজন আওয়ামী লীগ এবং একজন জামায়াতে ইসলামীর নেতা। এই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করলেও স্থানীয় প্রশাসন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে পুরো এলাকার মানুষ তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

তাহেরুল ইসলাম তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গৃহবন্দি মা ও ভাইকে দ্রুত উদ্ধার করা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

এই বিষয়ে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব জানান, থানায় অনেক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন, তাই নির্দিষ্ট করে কারা সেখানে গিয়েছিলেন তা তিনি জানেন না। তবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসাটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে তিনি মনে করেন। চাকরির কারণে তিনি তার কর্মস্থলে থাকতে পারেন। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং বাদীকে থানায় পাঠিয়ে মামলা দায়ের করতে বললে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।