কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নতুন উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরে তীব্র আলোড়ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ৫২ সদস্যের এই নতুন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে মনোনীত মো. এনামুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে মামলা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শুধু আহ্বায়ক নয়, কমিটির আরও বেশ কয়েকজন নেতার রাজনৈতিক অতীত এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
দলের ভেতরে ওঠা অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। অভিযোগ করা হয়েছে যে, যথাযথ যাচাই-বাছাই বা স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া ছাড়াই বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে বসানো হয়েছে। দলের কিছু নেতা আরও গুরুতর অভিযোগ করে জানিয়েছেন, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বা অর্থের বিনিময়ে কমিটিতে পদ প্রদান করা হয়েছে। তবে লক্ষণীয় যে, এই আর্থিক লেনদেনের অভিযোগগুলোর পক্ষে অভিযোগকারী নেতারা এখন পর্যন্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আনতে পারেননি।
নতুন কমিটির আহ্বায়ক মো. এনামুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে পরিকল্পিতভাবে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করার চেষ্টা করছে।
গত ২৬ আগস্ট, বুধবার জাতীয় নাগরিক পার্টির মিঠামইন উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এই ৫২ সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় মিঠামইন উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. এনামুল ইসলামকে। তবে এই নিয়োগের পরপরই সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয় তার আইনি জটিলতা নিয়ে। অভিযোগ করা হচ্ছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে মামলা রয়েছে। মোট তিনটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে একটি মামলা কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় এবং বাকি দুটি মিঠামইন থানায় দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় দায়ের করা একটি মামলায় ৯৮ জনের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই মামলায় মো. এনামুল ইসলামকে তিন নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মামলার বাদী হিসেবে কিশোরগঞ্জের কলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মিঠামইন থানায় তার বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এনসিপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতা এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর ফৌজদারি মামলার অভিযোগ রয়েছে, তিনি কীভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের উপজেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে পারলেন?
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু এনসিপি নেতা দাবি করেছেন, মো. এনামুল ইসলাম অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। তাদের অভিযোগ, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় মিঠামইনে ছাত্র-জনতার একটি মিছিলে হামলার ঘটনায় তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তবে এনামুল ইসলাম এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জানান, তিনি কখনোই আওয়ামী লীগের কোনো সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন না এবং ছাত্র-জনতার ওপর কোনো ধরনের হামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার পাল্টা দাবি, বিএনপির নেতা জাহাঙ্গীর আলম এবং তার ভাই আলমগীর শিকদার তাকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এসব মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছেন। এছাড়া আহ্বায়ক পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তিনি সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
বিতর্ক কেবল আহ্বায়ক পদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব পদে নিয়োগ পাওয়া আব্দুর রহমান বাচ্চুর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মিঠামইন উপজেলার ঢাকী ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বাচ্চু আগে ওই এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। যদিও তিনি সাংগঠনিক পদে থাকার কথা অস্বীকার করেছেন, তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে তিনি সবসময় আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন।
একইভাবে, কমিটির সিনিয়র সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু হুরায়রার রাজনৈতিক অতীত নিয়েও আলোচনা চলছে। মিঠামইন উপজেলার হাজীপাড়া কাটখাল এলাকার বাসিন্দা আবু হুরায়রা আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে। তবে এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে আবু হুরায়রার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, শুধু মিঠামইন নয়, জাতীয় নাগরিক পার্টির বিভিন্ন উপজেলা কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক নেতার দাবি, যথাযথ যোগ্যতা বা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে আর্থিক সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলার অভিযোগ রয়েছে এবং যাদের রাজনৈতিক অতীত প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের যাচাই-বাছাই ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে দীর্ঘমেয়াদে দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আরেক নেতা সরাসরি অভিযোগ করেন, আর্থিক সুবিধা প্রদানের বিনিময়েই মো. এনামুল ইসলামকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। তবে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ না থাকায় সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এই পরিস্থিতি নিয়ে এনসিপির কিশোরগঞ্জ জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক মুরাদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, কমিটি ঘোষণার আগেই তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই বিতর্কিত বিষয়গুলো জানিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, যথাযথ তদন্ত বা যাচাই-বাছাই না করেই তড়িঘড়ি করে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, কয়েকজন স্বার্থান্বেষী লোকের কারণে পুরো দলের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
অন্যদিকে, জেলা এনসিপির সদস্যসচিব আরিফুল রহমান বাবু জানিয়েছেন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এই পুরো বিষয়টি নিয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাইফুল্লাহ হায়দারের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, যদি মামলা বা আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মিঠামইন উপজেলা এনসিপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে ওঠা এই বহুমুখী অভিযোগগুলো এখন দলটির ভেতরে বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় নেতাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই পুরো বিষয়টি একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। নেতাদের দাবি, কমিটিতে স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অতীত, মামলার সত্যতা এবং পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখলে দলের স্বচ্ছতা বজায় থাকবে এবং সাধারণ কর্মীদের আস্থা ফিরবে।




















