অসুস্থ মায়ের মুখে একমুঠো খাবার—দৃষ্টি না থাকলেও থেমে নেই মোখলেসুরের জীবনসংগ্রাম। ভোরের আলো ফুটতেই যখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ঘুমের ঘোরে, ঠিক তখনই লাঠি হাতে ঘর থেকে বের হন মোখলেসুর। চোখে তিনি কোনো আলো দেখতে পান না, কিন্তু হৃদয়ে বয়ে বেড়ান এক পাহাড় সমান দায়িত্ব—অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের মুখে যেন অন্তত দুবেলা খাবার তুলে দিতে পারেন।

জীবন তাকে দৃষ্টির আলো দেয়নি, কিন্তু প্রতিকূলতার মুখে হাল ছাড়তেও শেখায়নি। অন্যের করুণার পাত্র হতে বা মানুষের কাছে হাত পাততে তিনি নারাজ। তাই তিনি বেছে নিয়েছেন কঠোর পরিশ্রমের এক কঠিন পথ। গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তিনি সংগ্রহ করেন গাছের ছাল। দৃষ্টিহীন হয়েও স্পর্শের মাধ্যমে গাছের সঠিক অংশ খুঁজে বের করেন এবং সেগুলো ছাড়িয়ে শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করেন। এই কাজটি যেমন শ্রমসাপেক্ষ, তেমনি এর আর্থিক প্রাপ্তিও অত্যন্ত সামান্য। তবুও দিনের শেষে হাতে যা আসে, সেটাই তার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। কারণ সেই সামান্য টাকাই দিয়ে কেনা হয় মায়ের প্রয়োজনীয় ওষুধ, চাল-ডাল আর সামান্য কিছু খাবার।

নিজের সংগ্রামের কথা বলতে মোখলেসুর আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "আমি চোখে দেখতে পাই না, কিন্তু মায়ের ক্ষুধার কষ্ট আমি গভীরভাবে অনুভব করতে পারি। তাই যতদিন আমার শরীরে শক্তি আছে, আমি কঠোর পরিশ্রম করেই খাব, কারো কাছে হাত পাতব না।"

বৃদ্ধা মা ছেলের মুখে এই কথাগুলো শুনে নীরবে চোখের জল ফেলেন। তিনি জানেন, তার সন্তানের জীবন কতটা বন্ধুর এবং যন্ত্রণাদায়ক। তবুও ছেলের মুখে কখনো কোনো অভিযোগ শোনেননি। বরং প্রতিদিন তিনি প্রত্যক্ষ করেন, একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ কীভাবে অসীম সাহস আর ধৈর্য নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন।

মোখলেসুরের এই জীবনকাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত শক্তি কেবল শারীরিক সক্ষমতায় থাকে না, বরং থাকে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে। সীমাবদ্ধতা থাকা মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়। নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বেঁচে থাকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সত্যিকারের বিজয়।

আমরা সবাই যদি আমাদের চারপাশের এমন সংগ্রামী মানুষদের পাশে দাঁড়াই, তাদের উৎপাদিত পণ্য কিনি, কাজের সুযোগ করে দিই কিংবা সামান্য মানবিক আচরণ করি—তাহলেই হয়তো তাদের জীবনটি হবে কিছুটা সহজ। মনে রাখতে হবে, এদের প্রতি করুণা নয়, বরং যথাযথ সম্মান দেওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা প্রতিটি মানুষই আসলে একজন সত্যিকারের যোদ্ধা।