কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। রবিবার সকালে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে। সে সময় র‍্যাব দাবি করেছিল যে, মাদক উদ্ধার অভিযান চলাকালে এক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন কাউন্সিলর একরামুল হক। তবে এই সরকারি দাবির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক নির্মম ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরবর্তীতে ওই ঘটনার সময় একরামুল হকের স্ত্রীর সঙ্গে তার মুঠোফোনের একটি কলরেকর্ড ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পুরো দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মাদক উদ্ধারের দাবিটি ছিল নিছক সাজানো নাটক, যা কলরেকর্ডের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এবং দেশ-বিদেশে এই ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সেই কলরেকর্ডের এক হৃদয়বিদারক পর্যায়ে একরামুলের মেয়েকে তার বাবাকে প্রশ্ন করতে শোনা গিয়েছিল, ‘আব্বু, তুমি কানতেছ যে?’ এই করুণ আর্তনাদের পরপরই শোনা যায় একের পর এক গুলির শব্দ এবং চারপাশের শোরগোল। এভাবে কলরেকর্ডের মাধ্যমেই একরামুল হকের নির্মম মৃত্যুর প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছিল তার পরিবার। তবে তৎকালীন সরকারের ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনী ও কয়েকজন মন্ত্রীর সরাসরি হুমকির কারণে ওই সময়ে পরিবারটি ন্যায়বিচারের দাবি জানাতে পারেনি এবং কোনো আইনি পদক্ষেপ বা মামলা দায়ের করার সাহস পায়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি পুনরায় সামনে আসে এবং জনমনে আলোচনায় পরিণত হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে আবারও ন্যায়বিচারের দাবি জানানো হয় এবং মামলার আবেদন করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একরামুল হককে হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন প্রসিকিউশন এই প্রতিবেদনটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা 'ফরমাল চার্জ' দাখিল করবে। এরপর শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগ আমলে নেবে কি না এবং আসামিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন বিচারপতি।

প্রসিকিউশন সূত্রে আরও জানা গেছে, তদন্তে একরামুল হক হত্যাকাণ্ডে মোট ১১ জনের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।