ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসি যা অর্জন করেছেন, তা হয়তো আগামী কয়েক দশক কোনো খেলোয়াড়ের পক্ষে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তবে ৩৯ বছর বয়সি এই ফুটবল জাদুকর তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এমন এক সম্পূর্ণ নতুন ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে যাচ্ছেন, যা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কাতার বিশ্বকাপের মঞ্চে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এখন তাদের অন্যতম চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আগামী বুধবার আটলান্টায় বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ইংলিশদের বিপক্ষে মাঠে নামবে আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই দলটির। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০০টিরও বেশি ম্যাচ খেলে ১২৫টি গোল করলেও, মেসি তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে কখনোই ‘থ্রি লায়ন্স’ খ্যাত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ পাননি। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি এখন সারা বিশ্বের ফুটবল ভক্তদের জন্য চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং কঠিন। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি আর্জেন্টিনার হাত থেকে ফসকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ে ৩-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। এই ম্যাচে মেসি চলতি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো গোল করতে ব্যর্থ হলেও, টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে ৮টি গোল করে তিনি ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটিও নিজের দখলে রেখেছেন।
বিবিসি পণ্ডিত মিকাহ রিচার্ডসের মতে, ‘ইংল্যান্ড হয়তো মাঠের দৌড়ঝাঁপে আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি সক্রিয় থাকতে পারবে, কিন্তু আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে মেসি নামের এক অনন্য জাদুকর রয়েছেন। পুরো দল মূলত তার জন্যই খেলে। মেসি এমন সব অবিশ্বাস্য ও ছোট ছোট জায়গায় অবস্থান নেন যা সাধারণ খেলোয়াড়দের কল্পনার বাইরে। তার খেলায় যে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও আভা রয়েছে, তা বিশ্ব ফুটবলে সত্যিই অতুলনীয়।’
অন্যদিকে, ইংল্যান্ড দল কি মেসিকে ভয় পাবে, নাকি একে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখবে? সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ওয়েন রুনির মতে, মেসি রক্ষণভাগে তেমন অবদান রাখেন না, আর এটাই হতে পারে ইংল্যান্ডের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুযোগ। রুনি বলেন, ‘মেসি আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের জন্য একটি দুর্বলতা হিসেবে কাজ করতে পারে কারণ তিনি নিচে নেমে ডিফেন্ড করতে পছন্দ করেন না। তবে জুড বেলিংহামের মতো খেলোয়াড়রা ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। মেসিকে মার্ক করার মূল চাবিকাঠি হলো চরম মনোযোগ এবং খেলোয়াড়দের নিজেদের মধ্যে সঠিক যোগাযোগ বজায় রাখা।’
বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভের বিশ্লেষক ক্রিস সাটন মনে করেন, ইংল্যান্ডের নতুন কোচ টমাস টুখেল এবং তার শিষ্যরা আর্জেন্টিনার এই বর্তমান শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হতে মুখিয়ে থাকবেন। কারণ এই আর্জেন্টিনা দলটিকে হয়তো অপরাজেয় মনে না হলেও, তারা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচ জেতার পথ খুঁজে বের করতে অত্যন্ত পারদর্শী।
ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত তীব্র ও ঐতিহাসিক। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোল, কিংবা ১২ বছর পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের সেই আলোচিত লাল কার্ড—সব মিলিয়ে এই দুই দলের ম্যাচ মানেই ছিল টানটান উত্তেজনা। তবে দীর্ঘ ২১ বছর পর এই দুই পরাশক্তি কোনো সিনিয়র পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ২০০৫ সালে মেসির আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর এই দুদল মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু সেই অভিষেক ম্যাচে হাঙ্গেরির বিপক্ষে মাঠে নামার মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল ১৮ বছর বয়সি তরুণ মেসিকে। ফলে জেনেভার সেই প্রীতি ম্যাচে তার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার সুযোগ হয়নি। সেই ম্যাচটি ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জিতেছিল।
দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল বিশেষজ্ঞ টিম ভিকারি জানান, আর্জেন্টিনার সমর্থকরা ইংল্যান্ডকেই তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। তাই ইংল্যান্ডের মুখোমুখি না হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হওয়াটা ফুটবল ইতিহাসের একটি অপূর্ণ অধ্যায় থেকে যেত।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠাতে মেসি সব সময়ই ওস্তাদ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির সবচেয়ে প্রিয় প্রতিপক্ষ হলো বলিভিয়া, যাদের বিরুদ্ধে ১২ ম্যাচে তিনি করেছেন ১১টি গোল। এছাড়া ভেনেজুয়েলা ও ইকুয়েডরের বিপক্ষে যথাক্রমে ৭টি করে গোল রয়েছে তার ঝুলিতে। লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি উরুগুয়ের বিপক্ষে ৬টি এবং ব্রাজিলের বিপক্ষে ৫টি গোল করেছেন এই জাদুকর। ইউরোপীয় দলগুলোর মধ্যে ক্রোয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিপক্ষে ৩টি করে গোল করেন তিনি, যার মধ্যে ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একাধিক ম্যাচ খেলেছেন এমন দলগুলোর মধ্যে কেবল কাতারই (২ ম্যাচ) মেসিকে গোল করতে দেয়নি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের এই অধরা অধ্যায় পূর্ণ হতে দেখার জন্য এবং দুই পরাশক্তির এই ব্লকবাস্টার লড়াই উপভোগ করার জন্য বুধবার রাতে চোখ থাকবে পুরো ফুটবল বিশ্বের দিকে।











