বিশ্বকাপ ফুটবলের কলেবর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে ফিফা। ৪৮ দলের প্রথম বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগেই সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হতে পারে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা কেবল টুর্নামেন্টের আকারই বাড়াবে না, বরং বিশ্ব ফুটবলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।

বর্তমানে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে ৪৮টি দলের অংশগ্রহণের কথা চূড়ান্ত হয়েছে, যেখানে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তবে বর্তমানের এই কাঠামো বজায় রেখে যদি দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৪ করা হয়, তবে ম্যাচের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১২৮টিতে। অর্থাৎ, বর্তমান পরিকল্পনার চেয়ে আরও ২৪টি ম্যাচ অতিরিক্ত যোগ হবে। এর ফলে পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই মেগা ইভেন্টটি অন্তত আরও এক সপ্তাহ দীর্ঘ হতে পারে, যা আয়োজক দেশ এবং খেলোয়াড় উভয়ের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে আয়োজক দেশের ওপর অবকাঠামোগত চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। অতিরিক্ত দলের জন্য আরও বেশি আধুনিক স্টেডিয়াম, উচ্চমানের হোটেল, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ মাঠ এবং বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের প্রয়োজন হবে। ফলে আয়োজনের ব্যয় এবং ব্যবস্থাপনার জটিলতা অনেক বাড়বে।

তবে অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ওপর। দল সংখ্যা বেড়ে গেলে বড় দেশগুলোর জন্য মূল আসরে জায়গা করে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। এতে বাছাইপর্বের তীব্রতা এবং বাণিজ্যিক আকর্ষণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থাগুলোর সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পন্সরশিপ থেকে প্রাপ্ত আয় হ্রাস পেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে এই সংস্থাগুলো আর্থিক সহায়তার জন্য ফিফার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা বিশ্ব ফুটবলে ফিফার একচ্ছত্র আধিপত্য ও প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এই পরিকল্পনার বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন অনেক ফুটবল ব্যক্তিত্ব। উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্ডার চেফেরিন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ৬৪ দলের বিশ্বকাপ মোটেও ভালো ধারণা নয়। তার মতে, এতে বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ এবং বাছাইপর্বের গুরুত্ব—উভয়ই হ্রাস পাবে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা।

অন্যদিকে, ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর যুক্তি ভিন্ন। তিনি মনে করেন, বিশ্বকাপ কেবল ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী দেশগুলোর একচেটিয়া অধিকার হওয়া উচিত নয়; বরং এটি হওয়া উচিত পুরো বিশ্বের। ছোট দেশগুলোকে মূল আসরে খেলার সুযোগ দিলে তারা ফুটবল উন্নতির অনুপ্রেরণা পাবে এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে।

২০৩০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। আর ২০৩৪ সালের একক আয়োজক হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে সৌদি আরব। তবে ৬৪ দলের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে পাহাড়প্রমাণ। কারণ তখন আরও বিপুল সংখ্যক স্টেডিয়াম এবং উন্নত নাগরিক সুবিধার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ২০৩৪ সালে রমজান মাসের সময়সূচির কারণে বিশ্বকাপের ক্যালেন্ডার নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে, যা একটি জটিল প্রক্রিয়া।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা। বিশ্বকাপের সময়সীমা এবং ম্যাচের সংখ্যা বাড়লে খেলোয়াড়দের ওপর প্রচণ্ড শারীরিক চাপ সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি নিয়ে বিশ্বের বড় ক্লাবগুলো এবং তারকা খেলোয়াড়রা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বকাপ দেশীয় লিগগুলোর সূচিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিশেষে, ৬৪ দলের বিশ্বকাপ অনেক দেশকে সুযোগ দিলেও এর সাথে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, অবকাঠামো, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য এবং প্রতিযোগিতার মান বজায় রাখার মতো গুরুতর বিতর্ক। ফিফা শেষ পর্যন্ত এই পথে এগোবে কি না, তা নির্ভর করবে ৪৮ দলের প্রথম বিশ্বকাপের সাফল্য এবং তার সামগ্রিক মূল্যায়নের ওপর।