মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা, যা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বড় প্রভাব ফেলছে।
টানা চতুর্থ দিনের মতো দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল তেলের মূল্য প্রায় ৯৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং ইকোনমিকস-এর তথ্যানুযায়ী, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই (WTI) অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৩.৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৮৭.৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ব্রেন্ট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৩.৪৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৪.৪৭ ডলার হয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার তেলের দাম ২ শতাংশ এবং এক সপ্তাহের সামগ্রিক হিসেবে দাম বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার এই চক্র জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী টানা ১১তম দিনের মতো ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো তেহরানের সেই সক্ষমতাকে দুর্বল করা, যার মাধ্যমে তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি বা হুমকি দিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার সম্ভাবনা নেই। বরং তিনি সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এই সম্ভাব্য অভিযানের আওতায় পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে অবস্থিত সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হুতি বিদ্রোহীরা কোনো বাধা সৃষ্টি করলে তার কঠোর জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প।
জ্বালানি বাজারের এই পরিস্থিতি নিয়ে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের বিশেষজ্ঞ জে হ্যাটফিল্ড বলেন, “বর্তমান খবরের প্রবাহ এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। যদিও আমরা এখনো এমন চরম পরিস্থিতি দেখিনি, তবে তা ঘটলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।”
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগর উপকূলে অবস্থিত কাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়াম টার্মিনালে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। উল্লেখ্য, এই টার্মিনালটি কাজাখস্তানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা এখন বহুমুখী সংকটের মুখে।











