জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন অসাম্প্রদায়িক নেতা, যিনি দেশের সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষকে সমানভাবে ধারণ করেন এবং তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫৩তম আবির্ভাব তিথি বা জন্মাষ্টমী উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন।

অনুষ্ঠানে রাশেদ খাঁন বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে, যেখানে ধর্ম হবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, কিন্তু নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার হবে সবার জন্য সমান। তিনি উল্লেখ করেন, একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণে ধর্মীয় সম্প্রীতির কোনো বিকল্প নেই।

শ্রীকৃষ্ণের জীবনদর্শনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হলেও তার জীবন, দর্শন ও শিক্ষা আজও আমাদের সমাজে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের শিখিয়েছেন যে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার বংশপরিচয় বা জন্মগত পরিচয়ে নয়; বরং তার কর্মের মাধ্যমেই তার প্রকৃত মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হয়। তিনি সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিয়েছিলেন। তাই শ্রীকৃষ্ণের সেই মহান আদর্শ ধারণ করে আমাদের সবাইকে একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ এবং মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার আহ্বান জানিয়ে রাশেদ খাঁন বলেন, আমরা যে ধর্মেরই অনুসারী হই না কেন, সকল ধর্মেরই মূল শিক্ষা হলো শান্তি, শৃঙ্খলা, মানবতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি। বাংলাদেশে কোনো নাগরিক যেন তার ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার না হন, এটি আমাদের সকলের প্রত্যাশা এবং সরকারের লক্ষ্য।

অতীতের দুঃখজনক ঘটনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অতীতে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশ্বজিৎকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আমরা চাই না, ভবিষ্যতে আর কোনো বিশ্বজিৎ এ ধরনের অমানবিক ও নৃশংস হামলার শিকার হোক। এ ধরনের সহিংসতা এবং বৈষম্যের সংস্কৃতি যেন আর কখনো এই দেশে ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে যেন বৈষম্যের শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বর্তমান সরকার এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আইনি অধিকার নিশ্চিত থাকবে। কোনো সনাতন ধর্মাবলম্বীর ওপর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হামলা বা নিপীড়নের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক। একটি অসাম্প্রদায়িক, শান্তিপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের আচার-অনুষ্ঠান ভিন্ন হলেও শান্তি, মানবতা, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য সব ধর্মেরই অভিন্ন। শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শন থেকে আমরা সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং সব ধরনের অনিষ্ট থেকে দূরে থাকার শিক্ষা পাই। এই মহান শিক্ষাকে আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ধারণ করতে হবে।

উপাচার্য আরও বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, যেখানে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্মীয় অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবেন এবং নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম পালন করতে পারবেন। একই সঙ্গে ভিন্নমতের মানুষের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

পরিশেষে উপাচার্য বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, মানবিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এগিয়ে নিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সকল ভেদাভেদ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় সম্মিলিত ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানান তিনি। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল। তিনি জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য তুলে ধরে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানান এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।