বয়সের সাথে সাথে চুল পাকা একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও জৈবিক প্রক্রিয়া। সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথে চুলের গোড়ায় থাকা ‘মেলানিন’ নামক রঞ্জক উৎপাদনকারী কোষগুলোর কার্যকারিতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়, যার ফলে চুলের স্বাভাবিক রঙ হারিয়ে গিয়ে তা সাদা হতে শুরু করে। তবে বর্তমান সময়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রা ও পরিবেশের প্রভাবে অনেককেই দেখা যাচ্ছে যাদের বেশ কম বয়সেই চুল পেকে যাচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘প্রি-ম্যাচুর গ্রেয়িং’ (Pre-mature Graying) বা অকালপক্কতা। হঠাৎ করে কেন অসময়ে আপনার চুল পেকে যাচ্ছে? এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রধানত চারটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. মানসিক চাপ বা স্ট্রেস: আধুনিক নাগরিক জীবনে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের পাশাপাশি চুলের রঙের ওপরও মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে শরীরে যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, তা চুলের অকালপক্কতাকে ত্বরান্বিত করে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের কারণে অনিদ্রা, উদ্বেগ এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা তৈরি হয়, যা পরোক্ষভাবে চুলের ফলিকল বা গোড়ার ক্ষতি করে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক জীবনযাপন এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে চুলের স্বাভাবিক রঙ কিছুটা ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে।

২. অটো-ইমিউন রোগ: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন ভুলবশত সুস্থ কোষগুলোকে শত্রু মনে করে আক্রমণ করে, তখন তাকে অটো-ইমিউন রোগ বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো অনেক সময় চুলের মেলানিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে আক্রমণ করে বসে। এর ফলে চুলের প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন রঞ্জক নষ্ট হয়ে যায় এবং খুব দ্রুত চুল সাদা হতে শুরু করে। এটি একটি জটিল শারীরিক প্রক্রিয়া যা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সমাধান করা সম্ভব নয়।

৩. ভিটামিন বি-১২ এর অভাব: শরীরের সামগ্রিক শক্তি এবং রক্তে লোহিত কণিকার সুস্থতার জন্য ভিটামিন বি-১২ একটি অপরিহার্য উপাদান। এই ভিটামিনটি চুলের বৃদ্ধি এবং এর স্বাভাবিক রঙ বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রক্তে লোহিত কণিকার প্রধান কাজ হলো চুলের গোড়াসহ শরীরের প্রতিটি কোষে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া। শরীরে ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি দেখা দিলে চুলের কোষগুলো প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন পায় না, ফলে কোষগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অসময়ে চুল পেকে যায়।

৪. ধূমপান: ধূমপানের সাথে অকালপক্কতার একটি সরাসরি এবং গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে ৩০ বছর বয়সের আগেই চুল পেকে যাওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি। ধূমপানের ফলে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, যার ফলে চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয় এবং চুল ঝরে পড়ার হার বেড়ে যায়। এছাড়া তামাকের বিষাক্ত উপাদানগুলো শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে, যা চুলের গোড়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দ্রুত চুল পাকার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সুতরাং, অকালপক্কতা কেবল একটি বাহ্যিক সমস্যা নয়, বরং এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যার সংকেত হতে পারে। তাই এই সমস্যা দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: জিও নিউজ