দেশের অন্যতম সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। মোবাইল ফোনের চ্যাট হিস্ট্রি, বিক্রয়সংক্রান্ত গোপন মেসেজ ও হিসাবের বিভিন্ন ছবি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সাড়ে ৭২ কোটি টাকার ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
সম্প্রতি ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ঢাকার প্রিভেন্টিভ টিম একটি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গাজীপুরের ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে গোয়েন্দা দল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে জব্দকৃত মোবাইল ফোনগুলোর ডিজিটাল তথ্য ও মেসেজগুলো বিশ্লেষণ করেই রাজস্ব ফাঁকির এই বিশাল অংকের তথ্য নিশ্চিত করা হয়। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের দুটি বিশেষ টিম একযোগে সিগারেট কারখানা এবং এর নিকটবর্তী একটি গুদামে অভিযান চালায়। অভিযান চলাকালীন দেখা যায়, কারখানার প্রধান গেট বাইরে থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে, অথচ ভেতরে পুরোদমে উৎপাদন কার্যক্রম চলছিল। গোয়েন্দা দল বারবার গেট খুলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও কারখানার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে পরিস্থিতি বিবেচনায় গোয়েন্দা দলের সদস্যরা দেয়াল টপকে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করেন।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কারখানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর গোয়েন্দা দল সরাসরি সিগারেট উৎপাদনের কার্যক্রম দেখতে পায়। এ সময় কারখানা চত্বরে অস্বাভাবিক ধোঁয়া দেখে কর্মকর্তারা সেখানে ছুটে যান এবং দেখতে পান যে, সেখানে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল ও নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। কর্মকর্তারা যখন এই পোড়ানো সিগারেটের স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় বৈধ দলিলপত্র দেখতে চান, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে ব্যর্থ হয়। এমনকি, এ ধরনের সিগারেট ও ব্যান্ডরোল পুড়িয়ে ফেলার জন্য কোনো বিভাগীয় কর্মকর্তার পূর্বানুমতি নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তারা জানান যে, এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার একটি লিখিত বিবৃতিতে স্বীকার করেন যে, আনুমানিক ৫০ লাখ শলাকা নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। গোয়েন্দা দল পোড়া ব্যান্ডরোলের অবশিষ্টাংশ আলামত হিসেবে জব্দ করে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, কারখানা এবং তৎসংলগ্ন গুদাম ও আবাসিক ভবনে তল্লাশি চালিয়ে স্ট্যাম্প, ব্যান্ডরোল, সিগারেট উৎপাদনের বিভিন্ন কাঁচামাল এবং ৩টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। এ সময় কিছু বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেটের নমুনা ও খালি প্যাকেটও উদ্ধার করা হয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধান ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনায় ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে যে, প্রতিষ্ঠানটি বৈধ স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবহারের পাশাপাশি গোপনে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছিল। উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোনের চ্যাট হিস্ট্রি, বিক্রয় সংক্রান্ত গোপন মেসেজ এবং হিসাবের ছবিগুলো অধিদপ্তরের আইটি ও সাইবার ফরেনসিক টিম অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করেছে। প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্তের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ প্রায় সাড়ে ৭২ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে।




















