দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৫ হাজার সম্ভাবনাময় মুখ খুঁজে বের করতে ‘উদ্যোগ’ শীর্ষক একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উপজেলাভিত্তিক এই অনন্য উদ্যোগের আওতায় নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন সুবিধা দেওয়া হবে। এই প্যাকেজের আওতায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট গত ১৩ সেপ্টেম্বর এই কর্মসূচির বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করে।

নীতিমালাটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো দেশের তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা মেধাবী তরুণদের খুঁজে বের করে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে প্রথম পর্যায়ে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। এছাড়া দেশের অন্যান্য জেলার অন্তর্ভুক্ত উপজেলার উদ্যোক্তারা ১ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ পাবেন। আগ্রহীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, এসএমই পোর্টাল এবং দেশের যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে আবেদন ফরম ডাউনলোড করতে পারবেন। নির্ধারিত ফরমটি যথাযথভাবে পূরণ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা জেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে ওই ব্যাংকে আগে থেকে অ্যাকাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক নয়।

আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, দক্ষতা উন্নয়ন বা উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ সনদ (যদি থাকে) এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার বা কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত নাগরিক সনদ সংযুক্ত করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্য থেকে একটি ব্যাংককে ‘লিড ব্যাংক’ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে, যারা মূলত আবেদন প্রক্রিয়া সমন্বয় করবে। তবে আবেদন করলেই ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। চূড়ান্ত মনোনয়নের পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তাদের নিজস্ব ঋণনীতি ও প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা নেবে। কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে ব্যাংককে অবশ্যই তার সুনির্দিষ্ট কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে।

অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার ব্যবসার ধরন, ব্যবসায়িক চাহিদা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণ ও অনুদানের অনুপাত হবে ৫০:৫০। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যবসার জন্য ১২ লাখ টাকার প্রয়োজন হলে উদ্যোক্তা ৬ লাখ টাকা ঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে পেতে পারেন। উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ বা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থও সামগ্রিক পরিকল্পনায় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এই কর্মসূচির বিশেষ দিক হলো, উদ্যোক্তাদের শুধু অর্থায়ন নয়, বরং ব্যবসা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দেওয়া হবে। নির্বাচিতদের আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের পরামর্শ, বিজনেস প্ল্যান তৈরি এবং বাজার সংযোগের মতো সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ ব্যবসা নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সহায়তা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোরভাবে জানিয়েছে, এই কর্মসূচির সুবিধা পেতে কোনো ধরনের তদবির করা যাবে না। তদবিরের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রার্থিতা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হবে। এছাড়া ব্যাংকগুলোকে গ্রাহক পরিচিতি যাচাই (কেওয়াইসি), সিআইবি রিপোর্ট এবং লেনদেন তদারকির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে। তরুণদের স্বাবলম্বী করার এই স্বপ্নযাত্রা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তৃণমূল পর্যায়ের এই উদ্যোগ সফল হলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে এবং বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই কর্মসূচির স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিবিড় তদারকি করবে এবং যোগ্য ও প্রকৃত উদ্যোক্তারা যাতে সঠিক সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি সোনালী সুযোগ, যা তাদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করবে।