সাধন সাহা জয়

​ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর পৌর শহরের তিতাস (বুড়ী) নদীর পাড়ে অবস্থিত প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক জমিদার মঠটি আজ ধ্বংসের মুখে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিদর্শনটি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে বিলুপ্তির পথে রয়েছে।

​ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় দুইশত বছর আগে নবীনগরের জমিদার সীতারাম পোদ্দার মারা যাওয়ার পর তার স্মৃতিকে অম্লান রাখতে তার পুত্রবধূ রাধারানী রায় চৌধুরানী নবীনগর মৌজার সাবেক সেটেলমেন্ট ১ নম্বর খতিয়ানের ২৬৬১ দাগের ০.০২ একর ভূমির ওপর এই মঠটি নির্মাণ করেন।

প্রায় ২০০ ফুট উচ্চতা ও ৯০ ফুট প্রশস্ত (বেড়) বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক মঠটি দিয়ে দূরদূরান্ত থেকে নবীনগর পৌর শহরকে চেনা যেত। সে সময়ে সিমেন্টের প্রচলন না থাকায় ইট ও বিশেষ পদ্ধতিতে চুনের মিশ্রণে তিতাস নদীর তীরে এটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল তিন বছর। তখন মঠটির পূর্ব পাশে নদী, উত্তর পাশে খাল এবং অন্যান্য পাশে জনমানবহীন এলাকা ছিল।

সে সময় নবীনগর বাজারে বণকর সাহার মুদি দোকান, স্বদেশ সাহার কেরোসিন তেল ও দিনবন্ধু বণিকের লোহালক্করের দোকানসহ মাত্র কয়েকটি দোকান ছিল। ১৯৪৭ সালের পূর্বে এই মঠের ভেতর কামিনী বাবু নামের এক দর্জি কাজ করতেন।

​১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জমিদার বংশের উত্তরাধিকারীরা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই মঠটির রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ রয়েছে। পরবর্তীতে রাধারানীর পৌত্র গোপাল চন্দ্র রায় চৌধুরী মঠের জমিটি সালাম মেম্বারের কাছে বিক্রি করে দেন।

স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কামানের গোলার আঘাতে মঠের চূড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যদিও এর সুনির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। এর আগে ১৯৫০ সালের প্রচণ্ড ভূমিকম্পেও মঠের চূড়ার কিছু অংশ ভেঙে পড়েছিল।

দীর্ঘ অবহেলার পর ২০১১ সালের আগস্টে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে মঠটির আংশিক সংস্কার করা হয়, যার উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান।

​বর্তমানে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির গায়ে শত শত ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তে টিয়া, শালিক, কবুতর, প্যাঁচা ও কাকের মতো বিভিন্ন পাখি বাসা বেঁধে বসবাস করায় এর সৌন্দর্য অন্যরকম মাত্রা পেলেও জীর্ণদশার কারণে এটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

অবিলম্বে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের অধীনে এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মঠটি পুরোপুরি সংস্কার করে এর হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।