মশা নিধনে ভেজাল কীটনাশকের পরিবর্তে কেরোসিন সরবরাহ এবং বাসাবাড়ির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবৈধ দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজিসহ শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) এক বিশেষ এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ উঠেছে যে, একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি চক্র, ল্যাব কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশে মশা নিধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতের নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। শুধু দক্ষিণ নয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে এক বিশেষ দল এই অভিযান শুরু করে। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, সহকারী পরিচালক মেহেদী মুসা জেবিন এবং উপসহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমানের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের একটি দল বর্তমানে ডিএসসিসিতে অভিযান পরিচালনা করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অভিযান শেষ হওয়ার পর বিস্তারিত তথ্য ও প্রাপ্ত ফলাফল সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

দুদকের কাছে জমা পড়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১১ ও ২০১৯ সালে ভেজাল কীটনাশক সরবরাহের গুরুতর অপরাধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ‘দি লিমিট অ্যাগ্রো’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের মূলহোতা মিজানুর রহমান কৌশলে নাম এবং প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করে ‘ফরোয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে পুনরায় কাজ শুরু করেন। অভিযোগ করা হয়েছে যে, গত দুই বছরে ওই প্রতিষ্ঠানটিকে ডিএসসিসি থেকে তিনটি পৃথক কার্যাদেশের মাধ্যমে প্রায় ৪৮ কোটি টাকার কীটনাশক সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার সময় সঠিক মানের কীটনাশক দেখানো হলেও, মাঠপর্যায়ে ফগিং করার সময় সাধারণ কেরোসিন ছিটানো হচ্ছে। এই পরিকল্পিত প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। একই সাথে মশক নিবারণী দপ্তরের স্টোরকিপার এবং অ্যাকাউন্টস শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে, বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের নামে পরিচালিত কার্যক্রমেও ব্যাপক অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ফ্ল্যাট থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা ফি নেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ধানমন্ডি, আজিমপুর, কাঁঠালবাগান, কায়েতটুলী ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ১২০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, যারা বৈধভাবে দরপত্রের মাধ্যমে কোটি টাকা জামানত দিয়ে কাজ পেয়েছেন, তাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মারধর করে কাজ ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে ডিএসসিসিতে প্রতিবছর বর্জ্য সংগ্রহের নামে একটি বিশাল অবৈধ ‘ময়লা-বাণিজ্য’ পরিচালিত হচ্ছে, যার মাধ্যমে অসাধু চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দুদকের এই অভিযানের ফলে সিটি করপোরেশনের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।