কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় এক বিধবা নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণালংকার আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে দেবরের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার নাম করে এক নারী ও তার পরিবারের সদস্য মিলে প্রতারণার এই ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু অর্থ নয়, জালিয়াতির মাধ্যমে একটি ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে সামাজিক ও আইনি জটিলতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে অভিযুক্তরা। এই ঘটনায় চকরিয়ার সুমি আক্তার পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ঘটনাটি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের মরংঘোনা এবং কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এলাকার। মামলার বাদী সুমি আক্তার দুই সন্তানের জননী। তার অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে মালয়েশিয়াপ্রবাসী দেবর আজিজুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। শুরুতে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে তিনি এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না। তবে অভিযুক্তরা বিভিন্নভাবে তাকে মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করেন এবং নানা প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারকে রাজি করান।

আদালতে দাখিল করা অভিযোগে সুমি উল্লেখ করেছেন, ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়পাড়ায় হাসিনা বেগমের বাসায় অভিযুক্তদের উপস্থিতিতে একটি কথিত বিয়ের কাবিননামা সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই সময়ে কাবিননামায় বাদী ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর বর আজিজুর রহমান মালয়েশিয়া থেকে স্বাক্ষর করে কাবিননামা পাঠিয়ে দেবেন বলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের বিষয়টি কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে সুমির কাছ থেকে ২ লাখ টাকা, ৭০ হাজার টাকা, ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং এক ভরি স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়া হয়। এসবের আর্থিক মূল্যসহ মোট ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে এই মামলায়।

প্রতারণার চিত্রটি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন প্রায় তিন মাস পর সুমিকে একটি কাবিননামা দেওয়া হয়। সেখানে আজিজুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে বলে তাকে জানানো হয় এবং এমনকি মোবাইল ফোনেও আজিজুর রহমান স্বাক্ষর করার কথা স্বীকার করেছেন বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে কথাবার্তা ও আচরণে সন্দেহ তৈরি হলে সুমি যখন কাবিননামার মূল বালাম বা রেজিস্ট্রি বই দেখতে চান, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল তাকে একটি নকল কাবিননামা দেওয়া হয়। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট কাজীর কাছে গিয়ে মূল বালাম দেখতে চাইলে কাজী তা দেখাতে অস্বীকার করে সেখান থেকে চলে যান।

মামলায় ৫ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কাজী মোহাম্মদ নূর এলাহীকে, যিনি ১৬ নম্বর পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার। সুমি ও তার পরিবারের দাবি, কাবিননামায় কাজীর স্বাক্ষর ও সিল নিয়ে গুরুতর অসংগতি রয়েছে। উল্লেখ্য, কাজী মোহাম্মদ নূর এলাহী এর আগে দাবি করেছেন যে, তার স্বাক্ষর নকল করে তার ছেলে ওই বিয়ে পড়িয়েছেন। কাজির এই বক্তব্য মামলার রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি স্বাক্ষর জাল করা হয়ে থাকে, তবে কে সেই স্বাক্ষর ব্যবহার করল এবং কার মাধ্যমে এই কথিত বিয়ের রেজিস্ট্রেশন দেখানো হলো? এছাড়া একটি বড় আইনি অসংগতি হলো, কাজী মোহাম্মদ নূর এলাহী ১৬ নম্বর পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের রেজিস্ট্রার হলেও, সুমির শ্বশুরবাড়ি চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের মরংঘোনা এলাকায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ভিন্ন ইউনিয়নের একজন রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর ব্যবহার করে কোনাখালী এলাকায় কীভাবে এই কথিত নিকাহ সম্পন্ন হলো?

মামলার অভিযোগে সুমি আরও দাবি করেছেন যে, কাবিননামা ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তিনি সোচ্চার হওয়ার পর তাকে আসামিদের বসতবাড়িতে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট বিকেলে চকরিয়া থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। সুমির মতে, এই প্রতারণার ফলে তিনি শুধু আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হননি, বরং তার দুই সন্তান ও প্রয়াত স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি ও পারিবারিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

ঘটনার প্রতিকার চেয়ে সুমি আক্তার কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা করেছেন। মামলায় আজিজুর রহমান, জিয়াউর রহমান, নূর নাহার বেগম, হাসিনা বেগম ও কাজী মোহাম্মদ নূর এলাহীকে আসামি করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪০৬, ৪২০ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার বিষয়ে সুমির আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম চৌধুরী জানান, বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চলছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, কাজীর মূল বালাম বই, কাবিননামার ফরেনসিক পরীক্ষা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি নিলে এই জালিয়াতির আসল চিত্রটি বেরিয়ে আসবে।