রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় কড়া ভাষায় কথা বলেছেন দলটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য বাংলাদেশের মাটিতে কোনো সমাধি বা কবরের স্থান থাকবে না। বুধবার (২৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাঙামাটি শহরের একটি স্থানীয় রেস্তোরাঁয় এনসিপি ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে আয়োজিত এই সমন্বয় সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে সারজিস আলম বলেন, ‘শেখ হাসিনা এতই পাপ করেছেন এবং তার পতন এতই নির্লজ্জভাবে হয়েছে যে, তার ফিরে আসা তো দূরের কথা, বাংলাদেশের মাটিতে তার কবর হওয়াও জুটবে না। এটি সম্পূর্ণভাবে তার নিজস্ব কর্মফল।’

পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর বর্তমান শাসনকাঠামো ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সারজিস আলম এক অদ্ভুত বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তিন পার্বত্য জেলায় সংসদ সদস্যরা এখন কার্যত ‘সেকেন্ডারি’ বা গৌণ প্রতিনিধি হয়ে পড়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বাস্তবে এই জেলাগুলো এখন জেলা পরিষদ এবং এর সদস্যদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে তিনি সংসদ সদস্য হতে চান নাকি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান— তবে তিনি চোখ বন্ধ করে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদটিই বেছে নেবেন। একইভাবে উপজেলা চেয়ারম্যান পদের চেয়েও অনেকে জেলা পরিষদের সদস্য হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেন।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তিনি বলেন, ‘যদি জেলা পরিষদগুলোকে বিএনপির স্থানীয় কমিটি বানিয়ে দেওয়া হয়, তবে এর মাধ্যমে গণতন্ত্র কীভাবে প্রতিষ্ঠা হবে? আমরা এই প্রশ্নটি সরাসরি তারেক রহমানের কাছে করতে চাই।’ তিনি অবিলম্বে জেলা পরিষদগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে দ্রুত নির্বাচনের আহ্বান জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে সারজিস আলম বলেন, প্রতি বছর জেলা পরিষদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই অনুপাতে স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। তার দাবি, জেলা পরিষদগুলোকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চর্চা প্রবল হয়ে উঠেছে।

বিএনপির বর্তমান শাসনপদ্ধতি ও দলীয় কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপি যে ধরনের নিপীড়ন ও জুলুমের শিকার হয়েছিল, বর্তমানে বিএনপি নিজেই সেই একই পথ অনুসরণ করছে। আওয়ামী লীগ আমলে যে চিত্রটি ধীরে ধীরে ফুটে উঠছিল, বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই তা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুক্ষিগত করার চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। একইসাথে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগঠনগুলোকে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তারা কোন দলকে সমর্থন করবে।

সভায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা সরোয়ার তুষার বলেন, বাংলাদেশের বহু জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের স্বাতন্ত্র্য এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সবাইকে একটি একক পরিচয়ে পরিচিত করার যে প্রবণতা রয়েছে, এনসিপি তার ঘোর বিরোধী। তিনি বলেন, প্রত্যেক জাতিসত্তার নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়কে যথাযথ সম্মান করতে হবে। পাশাপাশি বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পার্বত্য এলাকায় বিভাজন তৈরির অভিযোগ তুলে সরোয়ার তুষার বলেন, এখানকার একজন সংসদ সদস্যকে অসুস্থতার অজুহাতে সরিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে অন্য একজনকে এনে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তার অধীনে কেউ কাজ করে শান্তি পাবেন না। তবে এনসিপি ক্ষমতায় গেলে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব বাড়িয়ে সেখানে তিনজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এনসিপির রাঙামাটি জেলা কমিটির সদস্য সচিব মো. শোয়েবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় কেন্দ্রীয় নেতা সরোয়ার তুষার, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিন সুজা, রাঙামাটি জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন চৌধুরী, প্রিয় চাকমা, শহিদুল ইসলাম, জুরাছড়ি উপজেলার আহ্বায়ক মিশন চাকমা, লংগদু উপজেলার সদস্য সচিব এরিক চাকমা, শ্রমিক শক্তির সংগঠক আমির উদ্দিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। সভা শেষে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা, তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন বিস্তৃত করা এবং স্থানীয় জনগণের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পূরণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।