মানবতা যখন কথা বলে, তখন দূর হয়ে যায় অভাবের অন্ধকার। নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেলের জীবনগল্পটি ঠিক তেমনই এক অনুপ্রেরণার উৎস। অভাবের তাড়নায় যখন অনেক অসহায় বাবা-মা তাদের daughters-দের বিয়ের খরচ জোগাতে হিমশিম খান, ঠিক তখনই দেবদূতের মতো তাদের পাশে দাঁড়ান রুবেল। শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, নিজের মেয়ের মতো করে ধুমধাম আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিয়ে দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

সম্প্রতি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামে এমনই এক আনন্দময় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ের আয়োজন করেছিলেন রুহুল আমিন রুবেল। দীর্ঘ এক দশক আগে বাবাকে হারিয়েছেন তিথি। এরপর থেকে মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে অত্যন্ত কষ্টের সাথে মেয়েকে বড় করেছেন জহুরা। অভাবের সংসারে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও মেয়েকে মানুষ করলেও বিয়ের বয়স আসতেই নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। অর্থের অভাবে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করা তার জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে আলোর দিশারি হয়ে আসেন রুবেল।

শনিবার তিথির বিয়ের দিনটি ছিল উৎসবমুখর। সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে ছিল আনন্দের আমেজ। বাড়ির সামনে সুন্দর করে তৈরি করা হয় বিয়ের গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের বসার জন্য যথাযথ চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়। রান্নার আয়োজন ছিল রাজকীয়—মেন্যুতে ছিল গরু, খাসি, মুরগি, ডিম ও পোলাওসহ নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার। অন্যদিকে বাড়ির জরাজীর্ণ একটি ছোট কক্ষে তখন সাজানো হচ্ছিল নববধূ তিথিকে। একদিকে উৎসবের ব্যস্ততা, অন্যদিকে কনের সাজ—সব মিলিয়ে দরিদ্র পরিবারটির ঘরে যেন নেমে এসেছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সুখের জোয়ার।

তিথির মা জহুরা খাতুন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেই তিনি রুহুল আমিন রুবেলের এই মহৎ উদ্যোগের কথা জানতে পারেন। যোগাযোগের পর রুবেল তিথির পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং বিয়ের পুরো দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান। শুক্রবার রাতে গায়ে হলুদের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসব। শনিবার জুমার নামাজের পর বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা কনের বাড়িতে উপস্থিত হন। রুবেলের পক্ষ থেকে সোনার আংটি দিয়ে বরকে বরণ করে নেওয়া হয় এবং এরপর সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।

আবেগাপ্লুত মা জহুরা খাতুন বলেন, “মেয়ের বিয়ে নিয়ে আমি ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু রুবেল সাহেব দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের মেয়ের মতো করে পুরো আয়োজন করেছেন। এমন জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন আমাদের পরিবারের জন্য ছিল কল্পনারও বাইরে।” নববধূ তিথি বলেন, “বাবা পাশে নেই, কিন্তু বিয়ের দিনে তার অভাব খুব একটা অনুভব করিনি। এত বড় আয়োজন দেখে আমি নিজেই অবাক হয়েছি।” বর তরিকুল ইসলামও কনে পক্ষের আতিথেয়তা ও রুবেলের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন।

স্থানীয় ইমাম ও গ্রামবাসী রুবেলের এই নিঃস্বার্থ কাজের প্রশংসা করে বলেন, বছরের পর বছর ধরে অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব নেওয়া নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষরা যদি এভাবে এগিয়ে আসেন, তবে আরও অনেক অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে।

রুহুল আমিন রুবেল জানান, কোনো প্রচার বা খ্যাতির উদ্দেশ্যে নয়, বরং পরকালের সওয়াবের কথা চিন্তা করেই গত ২৪ বছর ধরে তিনি এই কাজ করে যাচ্ছেন। তিথির বিয়েটি ছিল তার উদ্যোগে সম্পন্ন হওয়া ১১২তম বিয়ে। তার এই নিঃস্বার্থ সেবা আজ সমাজের সামনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।