পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং অত্যন্ত সহজলভ্য একটি খাবার হলো ডিম। প্রোটিনের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে পরিচিত এই খাবারটি শুধু শরীর গঠনই করে না, বরং ভিটামিন সি ব্যতীত প্রায় সব প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের এক চমৎকার ভাণ্ডার। সাশ্রয়ী দামের কারণে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিমের বিশেষ স্থান রয়েছে। তবে অনেক সময় ডিম ভাঙার পর কুসুমে বা সাদার অংশে ছোট ছোট লাল কিংবা বাদামি রঙের রক্তের দাগ দেখা যায়। এই দৃশ্য দেখে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং মনে করেন ডিমটি নষ্ট হয়ে গেছে বা এটি খাওয়া অনিরাপদ, ফলে অনেক সময় মূল্যবান খাবারটি ফেলে দেওয়া হয়।
আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিমের এই রক্তের দাগ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মুরগির ডিম গঠনের প্রক্রিয়ায় যখন কুসুম তৈরি হয়, তখন ক্ষুদ্র কোনো কৈশিক রক্তনালি ফেটে যাওয়ার কারণে এই রক্তের দাগ তৈরি হয়। এটি কোনো সংক্রামক রোগের লক্ষণ নয় এবং এর মানে এই নয় যে ডিমটি নিষিক্ত। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে যে, রক্তের দাগ মানেই সেটি বাচ্চা হওয়ার ডিম। তবে বাস্তবে এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অনেক সময় ডিম্বনালি দিয়ে ডিম যাওয়ার সময় সামান্য মাংসের টুকরো বা রক্ত মিশে যেতে পারে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক নয়।
পুষ্টিগত দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি মাঝারি আকারের ডিমে প্রায় ৭৪ থেকে ৭৭ কিলোক্যালরি শক্তি, ৮ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন এবং ৫.২ গ্রাম ফ্যাট থাকে। এছাড়া এতে রয়েছে ভিটামিন এ, ডি, বি-কমপ্লেক্স এবং ভিটামিন বি১২-এর মতো প্রয়োজনীয় উপাদান। ডিমের বিশেষ গুণ হলো এতে লুটেইন ও জিয়াজেনথিন নামক দুটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা চোখের ছানি পড়ার ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি এতে থাকা ফসফরাস হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করে এবং জিংক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
রান্নার ধরনে ভিন্নতা থাকলেও পোচ, অমলেট কিংবা সিদ্ধ ডিমের জনপ্রিয়তা সব বয়সের মানুষের কাছেই সমান। তবে কুসুমে রক্তের দাগ দেখলে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন। খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ডিমটি ভালোভাবে রান্না করা হয়, তবে কুসুমের এই লাল বিন্দু বা রক্তের দাগ শরীরের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না। তবে যাদের মনে অস্বস্তি তৈরি হয়, তারা একটি চামচের সাহায্যে ওই নির্দিষ্ট অংশটি সরিয়ে ফেলে দিয়ে বাকি ডিমটি রান্না করে খেতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, ডিম অবশ্যই সম্পূর্ণ সিদ্ধ বা ভালোভাবে ভেজে খাওয়া উচিত।
তবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণ সব ধরনের রঙের পরিবর্তন নিরাপদ নয়। যদি দেখা যায় ডিমের সাদা অংশ (অ্যালবুমিন) গোলাপি, সবুজ বা লালচে হয়ে গেছে, তবে সেই ডিমটি কোনোভাবেই খাওয়া উচিত নয়। এই ধরনের রঙের পরিবর্তন সাধারণত 'সিউডোমোনাস' (Pseudomonas) নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে ঘটে। এই ব্যাকটেরিয়া ডিমের ভেতরে বিশেষ কিছু রঞ্জক পদার্থ তৈরি করে, যা ডিমকে খাদ্য হিসেবে অনিরাপদ করে তোলে। এছাড়া ডিম ভাঙার পর যদি তীব্র দুর্গন্ধ, অস্বাভাবিক রং বা পিচ্ছিল ভাব লক্ষ্য করা যায়, তবে তা দ্রুত ফেলে দেওয়া উচিত।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, খয়েরি ডিমে কি রক্তের দাগ বেশি থাকে? বিশেষজ্ঞদের মতে, সাদা খোলার ডিমের তুলনায় খয়েরি খোলার ডিমে রক্তের দাগের প্রবণতা কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো, খয়েরি খোলার রঙের কারণে অনেক সময় ছোট দাগগুলো সহজে চোখে পড়ে না, ফলে সেগুলো বাছাই প্রক্রিয়ার সময় বাদ পড়ে বাজারে চলে আসে। তবে রঙের পার্থক্যের সাথে পুষ্টিগুণের কোনো সম্পর্ক নেই; সাদা এবং খয়েরি উভয় ধরনের ডিমের পুষ্টিগুণ প্রায় একই।
সূত্র: হেলথলাইন।











