‘সেদিন এক প্যাকেট বাতাস কিনলাম, ওমা দেখি ভেতরে কয়েকটা চিপস ফ্রি দিয়েছে’—চিপসের প্যাকেটে বাতাসের আধিক্য নিয়ে এই কৌতুকটি আমাদের সমাজে বেশ প্রচলিত। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, যে চিপসগুলো আমরা এত তৃপ্তি করে খাচ্ছি, তাতে আলুর পরিমাণ আসলে কতটুকু? মচমচে ও মুখরোচক এই স্ন্যাকসগুলো কি সত্যিই আস্ত আলু কেটে তৈরি করা হয়, নাকি এর পেছনে কাজ করে ল্যাবরেটরির কোনো জটিল কৃত্রিম ফর্মুলা? আসল আলু বনাম ‘আলুর ময়দা’র এই লড়াইয়ে চিপসের প্রকৃত স্বরূপটি ঠিক কী, তা নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ সব তথ্য।

আসল আলু বনাম প্রক্রিয়াজাত চিপস: পার্থক্য কোথায়?

বেকারিঅ্যান্ডস্ন্যাকস ডটকম-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাজারে প্রচলিত লেজ-এর মতো জনপ্রিয় চিপসগুলো মূলত আসল আলু পাতলা করে কেটে সরাসরি ডুবো তেলে ভেজে তৈরি করা হয়। তবে অবাক করা বিষয় হলো, মার্কিন বহুজাতিক স্ন্যাকস জায়ান্ট প্যাপসিকো-এর নিজস্ব ভোক্তা গবেষণা বিভাগ ২০২১ সালে একটি জরিপ চালিয়ে দেখতে পায় যে, প্রায় ৪২ শতাংশ ক্রেতা জানতেনই না যে এই চিপসগুলো আস্ত আলু থেকে তৈরি হয়! তারা মনে করতেন, এগুলো কোনো কৃত্রিম পাউডার বা আলুর মণ্ড দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। বিজনেস ম্যাগাজিন ফরচুন ডটকম এবং ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোক্তাদের এই বিভ্রান্তি দূর করতে প্যাপসিকো তাদের প্যাকেজিংয়ে বড় করে ‘মেইড উইথ রিয়েল পটেইটোস’ বা ‘আসল আলু দিয়ে তৈরি’ কথাটি লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অন্যদিকে, প্রিংগলস-এর মতো প্রক্রিয়াজাত বা ‘মোল্ডেড’ চিপসগুলোর গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন। এগুলো সরাসরি আলু কেটে তৈরি করা হয় না। এই ধরনের চিপসে প্রায় ৪২ শতাংশ থাকে ‘ডিহাইড্রেইটেড পটেইটো ফ্লেক্স’ বা শুকিয়ে নেওয়া আলুর গুঁড়ো। বাকি অংশে থাকে কর্ন ফ্লাওয়ার, চালের গুঁড়া, গম এবং বিভিন্ন ধরনের স্টার্চের মিশ্রণ। বেকারিঅ্যান্ডস্ন্যাকস ডটকম-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমস্ত উপাদানের মিশ্রণে প্রথমে একটি মণ্ড বা ‘ডো’ তৈরি করা হয়। এরপর মেশিনের সাহায্যে সেটিকে নির্দিষ্ট ও নিখুঁত আকৃতি দিয়ে ভাজা হয়, যা আমরা প্রিংগলস হিসেবে চিনি।

আইনি লড়াইয়ে প্রমাণিত সত্য

চিপসের এই উপাদান নিয়েInterestingly যুক্তরাজ্যের আপিল আদালতে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর সংক্রান্ত একটি মামলায় আইনিভাবে এই তথ্য প্রমাণিত হয়। বিবিসি নিউজ এবং দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮-২০০৯ সালে প্রিংগলস-এর তৎকালীন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল’ কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যের উচ্চ আদালতে দাবি করেছিল যে, তাদের পণ্যটি কোনো ‘আলুর চিপস’ নয়, বরং এটি একটি কৃত্রিম স্ন্যাকস। তবে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত এই দাবির বিপক্ষে রায় প্রদান করেন। আদালতের চূড়ান্ত রায়ে জানানো হয়, যেহেতু প্রিংগলস-এ ৪২ শতাংশ আলুর উপাদান রয়েছে, তাই একে সাধারণ আলুর চিপস বা ক্রিস্প হিসেবেই গণ্য করা হবে। রায়ে স্পষ্ট করা হয় যে, উপাদানে ৪২ শতাংশ ডিহাইড্রেইটেড আলু থাকা মানেই এটি আলুর তৈরি পণ্য, যা সাধারণ বিচারবুদ্ধিতেই স্পষ্ট।

বাংলাদেশি চিপসের মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে পাওয়া চিপসের মান নিয়ে করা একটি গবেষণা ‘মাই ফুড রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে, যার শিরোনাম ‘কোয়ালিটি অ্যাসেসমেন্ট অফ পটেইটো চিপস ইন দ্য লোকাল মার্কেট অফ বাংলাদেশ’। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের গবেষক মেহের নাহিদ এবং তার দল বাংলাদেশের বাজার থেকে ২০টি স্থানীয় ব্র্যান্ডের চিপস সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্ট করেন। এই গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

প্রথমত, প্রায় প্রতিটি নমুনার মধ্যেই অনুমোদিত সীমার (২৫ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি চর্বি বা ফ্যাট পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত, ৮০ শতাংশ চিপস ব্র্যান্ডেই লবণের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হলো ‘অ্যাক্রিল্যামাইড’ ঝুঁকি। উচ্চ তাপমাত্রায় স্টার্চযুক্ত খাবার ভাজলে অ্যাক্রিল্যামাইড নামক একটি রাসায়নিক তৈরি হয়, যা মানবদেহে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ শতাংশ স্থানীয় চিপসের নমুনায় এই ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রা ছিল আশঙ্কাজনক। তবে আশার কথা হলো, দেশি চিপসগুলোতে সিসা, আর্সেনিক বা ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

এছাড়া বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ (বিজেএআর)-এ প্রকাশিত বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট (বিএআরআই)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র চিপস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান একই সয়াবিন তেল বারবার ফুটিয়ে চিপস তৈরি করে। তেলের এই পুনঃব্যবহার শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর ‘ট্রান্স-ফ্যাট’ তৈরি করে, যা হৃদরোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

চিপস খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

বেকারিঅ্যান্ডস্ন্যাকস ডটকম-এর খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিপস মূলত একটি ‘ক্যালোরি-ডেনস’ বা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার, যা সাময়িকভাবে পেট ভরিয়ে দিলেও শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগায় না। এর সামান্য কিছু উপকারিতা থাকতে পারে যদি তা অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে খাওয়া হয়। যেমন—আলুর কার্বোহাইড্রেইট বা শর্করা শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায় এবং তীব্র গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে লবণ বেরিয়ে গেলে চিপসের সোডিয়াম সাময়িকভাবে তা পূরণ করতে পারে।

তবে এর অপকারিতা অনেক বেশি। অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং ট্রান্স-ফ্যাট ধমনিতে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ডুবো তেলে ভাজার কারণে এতে প্রচুর চর্বি থাকে, যা দ্রুত ওজন বৃদ্ধি করে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, চিপস মচমচে করার প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন অ্যাক্রিল্যামাইড দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘হাও ডেঞ্জারাস আর মাই পটেইটো চিপস?’ প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, নিয়মিত চিপস খাওয়া মানে হলো সরাসরি তেল ও চর্বি খাওয়া। এক প্যাকেট চিপসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ওজনই থাকে শুধু তেলের! দেশের এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোকে খাদ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, বিশেষ করে শিশুদের চিপসের আসক্তি থেকে দূরে রাখা জরুরি। মুখরোচক স্ন্যাকস খেতে চাইলে ঘরে তৈরি আলুর চিপস, বেইকড চিপস কিংবা মিষ্টি আলুর তৈরি চিপস খাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প হতে পারে।