ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (সংশোধন) আইন ২০২৬: শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনার দাবি মামুনুল হকের
জীবনকালীন ভোগাধিকার বজায় রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান সংবলিত ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-কে শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনা করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি এই দাবি উত্থাপন করেন। একই সঙ্গে সংসদের তড়িঘড়ি প্রক্রিয়ায় এই আইনটি পাস করার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মামুনুল হক তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেন যে, সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া এই আইনটির বেশ কিছু ধারা ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হেবা’ (দান) ও ‘ফারায়েজ’ (উত্তরাধিকার)-সংক্রান্ত বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি করেছে। তার মতে, জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের এই নতুন আইনি বিধানটি ইসলামের মৌলিক শরিয়াহ আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরও বলেন, “বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই একটি মানবিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, তবে সে জন্য এমন কোনো আইনি বিধান প্রণয়ন করা উচিত নয়, যা শরিয়াহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার ও হেবার প্রতিষ্ঠিত নীতিকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে।” মাওলানা মামুনুল হকের মতে, কোনো ব্যক্তির জীবিত থাকা অবস্থায় ‘হেবা’ বা দান করা এবং মৃত্যুর পর ‘ফারায়েজ’ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করা—এই দুটি সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন এই আইন যেন কোনোভাবেই কোনো উত্তরাধিকারীকে তার শরিয়াহ নির্ধারিত ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
ইসলামে হেবার ক্ষেত্রে কেবল মালিকানা হস্তান্তরই যথেষ্ট নয়, বরং সম্পত্তির বাস্তব দখল ও কর্তৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, নতুন আইনে সরকার দাবি করেছে যে এটি সাধারণ হেবা বা মুসলিম আইনের হেবাকে প্রভাবিত করবে না। তবে বাস্তবে এই আইন কি হেবার শরয়ী কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন ও বিতর্কিত ব্যবস্থা তৈরি করছে না? বিশেষ করে, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রেখে যদি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নামে সম্পত্তি হস্তান্তর করেন, তবে প্রকৃত কবয, পূর্ণ মালিকানা এবং হস্তান্তরের চূড়ান্ততা নিয়ে গুরুতর শরয়ী প্রশ্ন সৃষ্টি হয়।
খেলাফত মজলিসের আমির আরও অভিযোগ করেন যে, হেবার নামে নির্দিষ্ট কোনো উত্তরাধিকারীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তা ইসলামের সামগ্রিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিলটি পাসের আগে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কথা থাকলেও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এটি পাস করা হয়েছে, যা দুঃখজনক।
বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি তাদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিতে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমুন্নত রাখা এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে ইসলামবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের মতো সুস্পষ্ট শরিয়াহ বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আইন এত দ্রুত পাস করা হলো কেন—এই প্রশ্নটি তিনি উত্থাপন করেন।
পরিশেষে, মাওলানা মামুনুল হক এই আইনের ১২২-এ এবং ১২২-বি ধারা দুটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। তিনি আহ্বান জানান, অভিজ্ঞ আলেম, মুফতি, ফকীহ এবং শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হোক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়, তবে তা করতে গিয়ে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজ-সংক্রান্ত বিধানকে কোনোভাবেই দুর্বল করা উচিত হবে না।















