সাবেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগে বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই অংশ হিসেবে সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস এবং ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ওয়াকিটকি ক্রয়ে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিদেশে পাচার করা সম্পদ জবতে যথাক্রমে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং আইল অব ম্যান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছে দুদক।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাবেক মুখ্য সচিব এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. আহমেদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তার বিরুদ্ধে চলমান এই অভিযোগগুলোকে ‘আদানি পাওয়ার লিমিটেড ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ’-এর তদন্তের সঙ্গে সংযুক্ত করে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হবে।
অন্যদিকে, ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভূমি দখল, নিয়োগ বাণিজ্য এবং দলীয় পদের কেনাবেচার পাশাপাশি বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দুদক বর্তমানে এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। কমিশন তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের এই অভিযোগটিকে দুদকের নোয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে তদন্তাধীন একটি মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করে তদন্ত করার সুপারিশ করেছে, যাতে তদন্ত প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হয়।
এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ওয়াকিটকি ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের অভিযোগ সামনে এসেছে। এই দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক এবং তদন্তের জন্য ইতোমধ্যে অনুসন্ধানকারী ও তদারককারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ওয়াকিটকি ক্রয়ের কাজ দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রতিষ্ঠানটি মূলত একটি চীনা কোম্পানির সনদ ব্যবহার করে নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছে। অন্যান্য সরকারি সংস্থার তুলনায় বহুগুণ বেশি দামে ওয়াকিটকি ক্রয় করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে এই কারসাজি করেছেন বলে দুদকের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি বিশেষ এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারেও বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে দুদক। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুক্ষ্মীলা জামানের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবৈধ সম্পদ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ব্যবসায়িক রেকর্ড জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়ায় বিশেষ সাফল্য এসেছে। পারস্পরিক আইনি সহায়তার আবেদন বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টের (এমএলএআর) মাধ্যমে মার্কিন সেন্ট্রাল অথরিটির অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের (ওআইএ) কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। সেই অনুরোধের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ইতোমধ্যে এই সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দুদককে পাঠিয়েছে।
একইভাবে, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, নাসরিন ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং ওয়ান প্রোপার্টি লিমিটেডের বিরুদ্ধে আইল অব ম্যান-এ পাঠানো এমএলএআর-এর যাবতীয় কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আইল অব ম্যান কর্তৃপক্ষ দুদকের পাঠানো আবেদনটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করেছে। কমিশনকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যাবতীয় সম্পত্তি আইল অব ম্যান কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করেছে। দেশের সম্পদ রক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল থেকে দুদক তাদের এই অভিযান অব্যাহত রাখবে বলে জানা গেছে।















