জাতীয় সংসদের ভেতরে এক উত্তপ্ত ও বিতর্কিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে। তাকে সংসদীয় কমিটিতে রাখা এবং তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় ও আইনি বিতর্ক চলে। মূলত নৈতিকতার প্রশ্নে গাজী নজরুল ইসলামকে কোনো সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত না করার জোরালো আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তবে এই বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে এই নাটকীয় বিতর্কটি সংঘটিত হয়। অধিবেশনের এক পর্যায়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কোটা থেকে যেহেতু উনাকে (গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটির সদস্য পদে সুপারিশ) দেওয়া হয়নি, তাই সে বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’ তবে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, নৈতিকতার দিক থেকে যেহেতু তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এই বিষয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তাই দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদের কোনো মর্যাদাপূর্ণ কমিটিতে তাকে রাখা সমীচীন নয়। নৈতিকতার প্রশ্নে তাকে সকল কমিটি থেকে দূরে রাখাই হবে উত্তম বলে তিনি মনে করেন।

বিরোধীদলীয় নেতার এই বক্তব্যের পর স্পিকারের অনুমতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘এখানে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদের কোনো না কোনো কমিটিতে তাকে রাখতে হয়। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোতে যেহেতু বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে নামগুলো দেওয়া হয়েছে, সেখানে তার (গাজী নজরুল) নাম ছিল না, তাই সেখানে তাকে রাখা হয়নি। সংসদীয় যে কমিটিগুলো আছে, সেখানে দুটিতে তাদের আপত্তি ছিল বলে রাখা হয়নি। তবে সামগ্রিক বিন্যাসে কোনো না কোনো কমিটিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, বিরোধীদলীয় নেতা নিজেই স্বীকার করেছেন যে গাজী নজরুল ইসলাম তাদের পক্ষ থেকে মনোনীত হয়ে ওই কমিটিতে যাননি। ফলে এই নিয়োগ নিয়ে কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই বলে তিনি দাবি করেন। তবে আলোচনা যখন গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদের বৈধতা নিয়ে মোড় নেয়, তখন সালাহউদ্দিন আহমদ এক ভিন্ন আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি জানান, জামায়াতে ইসলামী তার সদস্য পদ শূন্য করার জন্য নির্বাচন কমিশন ও স্পিকারকে চিঠি দিলেও, কেবল দল থেকে বহিষ্কার করা হলে সংবিধান অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয় না।

মন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, ‘এখানে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সরাসরি প্রযোজ্য হয় না, যদি না সদস্য নিজে পদত্যাগ করেন।’ এরপর তিনি কিছুটা রসিকতা ও কৌশলী ভঙ্গিতে বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এখন বিষয় হচ্ছে, আমি কি আপনাদের বুদ্ধি বাড়িয়ে দেব? আপনারা যদি সত্যিই চান তার আসনটি শূন্য হোক, তবে মনে রাখতে হবে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের পক্ষে ভোট দেননি এবং ভোটদানে বিরত ছিলেন; সেই ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর হতে পারে। এখন এই বিষয়টি যদি আপনারা কগনিজেন্সে (আমলে) নিয়ে মাননীয় স্পিকারকে মনোযোগ আকর্ষণ করেন কিংবা নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেন, তবে আমরা বিধি মোতাবেক সাংবিধানিকভাবে সহযোগিতা করতে পারি। এই বুদ্ধিটা আমি আপনাদের বিনা পয়সায় দিলাম।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান হাস্যরসের সাথে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, কোনো দুর্বল মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে হলে তাকে মেম্বার ইলেকশনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাঝে মাঝে আমাদের এরকম কিছু টিপস দেন, যা আমরা এনজয় করি। এইজন্যই সেদিন বলছিলাম যে, উনি থাকলে সংসদ প্রাণবন্ত হয়—তা পজিটিভ হোক বা নেগেটিভ, কিছু একটা হয়।’

ফ্লোর ক্রসিংয়ের বিষয়টি নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা এখন তাকে ফ্লোর ক্রসিংয়ের কথা বলব কেন? আমরা তো তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। আমরা এখন এটা বলতে পারি না যে, তিনি আমাদের দলের সদস্য হয়ে ফ্লোর ক্রসিং করেছেন কিংবা আমাদের সিদ্ধান্ত ভায়োলেট করেছেন। এটুকু বলার কোনো সুযোগ নেই।’ তবে তিনি পুনরায় নৈতিকতার বিষয়টি সামনে এনে বলেন, ‘আমরা আগেই অনাপত্তি জানিয়েছি যেহেতু আমাদের কোটায় তিনি আসেননি। কিন্তু জাতীয় সংসদের মতো একটি অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস হাউজে, যাকে আমরা নৈতিক কারণে বহিষ্কার করে চিঠি দিয়েছি, তাকে কোনো কমিটিতে না রাখাটাই অধিকতর উত্তম ছিল। আমি নৈতিকতার দিক থেকে এটি বলেছি। এখন এটি পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ আছে। কারণ বিভিন্ন সময় কমিটির সদস্য পরিবর্তন, অদল-বদল বা ড্রপ করার প্রক্রিয়া চলে। আমি মনে করি, নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি উদাহরণ হবে যদি তাকে কোথাও রাখা না হয়।’

বিরোধীদলীয় নেতার এমন দৃঢ় অবস্থানের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তার অনুরোধ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘এর দ্বারা আমাদের হয়তো বুঝে নিতে হবে যে, গাজী নজরুল ইসলামের সদস্যপদ বহাল থাকল, কিন্তু তাকে কমিটিতে রাখা যাবে না। আমি এর বেশি কিছু বুঝলাম না। কারণ, বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধে ইচ্ছা করলে এই কমিটি থেকে তাকে বাদ দেওয়া সম্ভব। যেহেতু এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি, তাই পুনর্গঠন করা যাবে। তাকে বাদ দিলে তা বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন হবে।’

মন্ত্রী আরও বিস্তারিতভাবে বলেন, ‘আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে কিছু বলতে চাইছি না। তাকে বাদ দেওয়া হলো। তবে আমরা বুঝে গেলাম যে, তার সদস্যপদ শূন্য করার পক্ষে বিরোধীদলীয় নেতা নন। কারণ দল থেকে বহিষ্কার করলে সংবিধান অনুযায়ী সদস্যপদ যায় না। সংসদ সদস্য যদি দলের বিপক্ষে ভোট দেন বা ভোটদানে বিরত থাকেন, তবে ৭০ বিধি অনুসারে তার আসন শূন্য হবে অথবা তিনি নিজে পদত্যাগ করলে তা সম্ভব। যেহেতু তিনি দলের মার্কা নিয়ে নির্বাচন করেছেন, তাই আইনি ভাষায় তিনি অস্বীকার করতে পারবেন না যে দলীয় সদস্যপদ বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্যপদ যায় না। সুতরাং বৈধ এটাই যে, তার সদস্যপদ বহাল থাকল। যদি বিরোধী দল রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের সময় তার অনুপস্থিতিকে গণ্য করে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চিঠি না দেয়, তবে তার সদস্যপদ বহাল থাকবে।’

পরিশেষে, গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটিতে রাখার বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধকে গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যদি বিরোধীদলীয় নেতা চান যে তার দলের মার্কা নিয়ে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোটদানে বিরত ছিলেন, সেই প্রেক্ষিতে তিনি ৭০ অনুচ্ছেদে তার আসন শূন্য করার জন্য চিঠি দিতে পারেন। আর যদি তিনি তা না চান, তবে সদস্য পদ শূন্য করার অন্য কোনো বিধি নেই। এখন যদি এই কমিটি থেকে নাম বাদ দিতে হয়, তবে আমরা বিরোধীদলীয় নেতার সম্মানার্থে তা করে দেব এবং তার সম্পর্কে আর চর্চা করব না।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত এবং নৈতিকতার প্রশ্নে করা আবেদনকে সমর্থন করায় ডা. শফিকুর রহমান তাকে ধন্যবাদ জানান। তবে ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা নিয়ে তিনি ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ বলছে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা ভোটদানে বিরত থাকলে আসন শূন্য হবে—তবে আমার জানামতে এই ব্যাখ্যা এখানে প্রযোজ্য হবে না।’

উল্লেখ্য যে, গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্কিত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ‘নৈতিক স্খলন’-এর অভিযোগে গত ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। তবে দলীয় বহিষ্কার সত্ত্বেও সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে। এই জটিল আইনি ও নৈতিক পরিস্থিতিই জাতীয় সংসদের ভেতরে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।