গুরুতর অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনর পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। তাঁর এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংবিধানের যথাযথ বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জাতীয় সংসদের শপথকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।

সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র আজ (শুক্রবার) বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তাঁর কাছে দাখিল করেছেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, "আমি উক্ত পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করেছি এবং এটি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছি।"

স্পিকার আরও জানান, যেদিন তিনি স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন, সেদিনই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবেও শপথ নিয়েছিলেন। একইভাবে ডেপুটি স্পিকারও শপথের সময় স্পিকারের শপথ গ্রহণ করে রাখেন বলে তিনি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মূল কারণ হিসেবে স্পিকার জানান, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে তিনি বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ। তাঁর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা এবং শারীরিক অসামর্থ্যের কারণে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি জটিলতার মতো মারাত্মক সমস্যায় ভুগছেন। এর আগে তাঁর হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর শরীরে 'অটোনমিক নিউরোপ্যাথি' (Autonomic Neuropathy) নামক একটি রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের প্রভাবে তিনি মাঝেমধ্যেই ক্ষণিক অচেতন হয়ে পড়েন। শারীরিক ও মানসিক এই চরম অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের গুরুভার বহন করা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী পদত্যাগের আবেদন জানান।

নিজের পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করেছেন। তিনি লিখেছেন, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং অদ্যাবধি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফলে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে যে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করেন। অতঃপর আপিল বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।

নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে দেশ পরিচালনা করছে এবং বর্তমানে সরকারি ও বিরোধী দলগুলো গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্রে আত্মবিশ্বাসের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই দেশে কোনো বড় ধরনের সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।

সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলাবেন। একই সঙ্গে, সংবিধানের নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদকে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।