প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার এবং তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আনার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা করেছেন বিএনপির তথ্য সম্পাদক ও খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের সমালোচনা করার অপরাধে কাউকে এভাবে আইনি মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি বিএনপি কোনোভাবেই সমর্থন করে না।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে সিফাত আব্দুল্লাহর গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হেলাল এসব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে, একজন কলেজছাত্রীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর আইনে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। সিফাতের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কটূক্তির অভিযোগ এবং তার গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হেলাল বলেন, ‘ঘটনাটি যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে আমি সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করতে বাধ্য। তারা এভাবে দমনমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে না।’
গণতন্ত্রে বাকস্বাধীনতার গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি মানুষের কথা বলার অধিকার থাকা উচিত। বাকস্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ নয়। সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কোনো কাজের সমালোচনা করলে তাকে এভাবে মামলার জালে জড়ানো হবে—এই ধরনের পদক্ষেপ বিএনপি সমর্থন করে না।’ তবে সিফাতকে গ্রেপ্তারের পেছনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের উচ্চপর্যায়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল কি না, সেই প্রশ্নে হেলাল কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী কিংবা সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য এমন নির্দেশ দেওয়া হয়নি।’ এর পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘স্থানীয় পুলিশ কেন এমন পদক্ষেপ নিল, সেটির বিষয়ে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
ঘটনার বিস্তারিত জানা গেছে যে, রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আজিজুল বারী হেলাল। তিনি তার বক্তব্যে ‘ঘটনাটি যদি সত্য হয়ে থাকে’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর গাজীপুর মহানগরীর গাছা এলাকার নিজস্ব বাসা থেকে সিফাত আব্দুল্লাহকে আটক করা হয়। জানা গেছে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার প্রতিবাদ জানিয়ে সিফাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। ওই ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, তার বাসায় মাত্র দুই মাসে প্রায় ৯ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে, যা অত্যন্ত অযৌক্তিক। এই অভিযোগ জানাতে গিয়ে তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উদ্দেশে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কথা বলেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং পরবর্তীতে পুলিশ তাকে আটক করে।
তবে সিফাতকে আটকের প্রকৃত কারণ এবং তার বিরুদ্ধে কোন আইনে মামলা করা হবে, তা নিয়ে পুলিশের দেওয়া বক্তব্যে এক অদ্ভুত অসংগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর প্রথমে পুলিশ জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করায় তাকে আটক করা হয়েছে। এরপর পুলিশ দাবি করে, তার বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে মামলা করা হবে। কিন্তু শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পুলিশের বক্তব্যে নতুন মোড় আসে। তখন দাবি করা হয়, সিফাত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, আর তাই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সবশেষে পুলিশ জানায়, নতুন কোনো আইসিটি বা কটূক্তির মামলায় নয়, বরং আগে থেকে বিদ্যমান একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আটক থেকে আদালতে প্রেরণ পর্যন্ত পুলিশের বক্তব্যে এই কয়েক দফা পরিবর্তন সিফাত আব্দুল্লাহর গ্রেপ্তারের প্রকৃত কারণ এবং আইনি বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এতে করে আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

















