ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতি ও দলিল সংরক্ষণের লক্ষ্যে গৃহীত বিশেষ প্রকল্পের আমূল পরিবর্তন আসছে। প্রকল্পের নামের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন কার্যক্রম, যার ফলে এর কার্যপরিধি আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে এই প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছিল ‘দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এর অডিও ভিজ্যুয়াল দলিলের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ’। তবে এখন এই নাম বদলে রাখা হচ্ছে ‘মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ, ডকুমেন্টারি তৈরি এবং গণতান্ত্রিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তৈরির লক্ষ্যে তথ্যচিত্র নির্মাণ’।
প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কাজের নতুনত্ব আনা এবং এর ব্যাপ্তি ও পরিসর সম্প্রসারিত করা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনার পরিবর্তে বাংলাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাসকে ধারণ করার জন্য এই নাম পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। গত ২ জুন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে গত ৮ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
তবে নাম ও লক্ষ্যের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। প্রায় এক বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও প্রকল্পের মূল কার্যক্রম এখনো শুরুই হয়নি। সূত্রমতে, প্রকল্পটিতে চরম ধীরগতি বিরাজ করছে এবং কিছু জটিলতা প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি নিরসনে এবং কার্যক্রম গতিশীল করতে এখন প্রকল্প সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আর্থিক হিসাব দেখা যায়, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। কিন্তু গত মে মাস পর্যন্ত প্রকৃত খরচ হয়েছে মাত্র ৪৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ফলে প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ শতাংশে। প্রকল্পের মূল মেয়াদ নির্ধারিত ছিল ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। যদিও বর্তমান সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় বাড়ানোর কথা বলা হয়নি, তবে নাম, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সংশোধনের পাশাপাশি মেয়াদের বিষয়ে নতুন প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ৬ মে এই সংশোধনী প্রস্তাবটি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আলী সরকার ‘আগামীর সময়’কে জানান, নাম পরিবর্তন এবং নতুন কার্যক্রম যুক্ত হওয়ার কারণে প্রকল্পের মূল ফোকাস জুলাই আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, মূল অনুমোদিত প্রকল্পের সমস্ত কার্যক্রম বজায় রেখেই নতুন কাজগুলো যুক্ত করা হচ্ছে। অর্থ বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, প্রকল্প শুরুর ১১ মাস পর, অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারিতে তারা অর্থ বরাদ্দ পেয়েছেন। এই বিলম্বের কারণেই মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এজন্য সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় না বাড়ালেও প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের কারিগরি দিক বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহের জন্য মূল ডিপিপিতে ১৫ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছিল। তবে দেশের প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (আরডিপিপি) মহান স্বাধীনতাযুদ্ধসহ বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও আর্কাইভিং কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের তৈরি নির্দেশিকা ও কর্মপদ্ধতির ভিত্তিতে দলিল সংগ্রহের কাজ শুরু হবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি আরডিপিপি অনুমোদনের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করার তাগিদ দিয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আলী সরকার আরও জানান, বাস্তবায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেসব কাজ ডিপিপি সংশোধন ছাড়াই করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কারণে ফুটেজ সংগ্রহ এবং ডকুমেন্টারি নির্মাণের মতো মূল কাজগুলো এখনো শুরু করা যায়নি। তবে প্রশাসনিক, সমন্বয়মূলক এবং প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো নিয়মিতভাবে চলছে। আরডিপিপি অনুমোদনের পর দ্রুত মূল কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক ম. জাভেদ ইকবালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভায় বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সভায় বলা হয়, আরডিপিপি অনুমোদনের জন্য বসে না থেকে যেসব কাজে কোনো নীতিগত বা প্রশাসনিক বাধা নেই, সেগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। পাশাপাশি মূল কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি অব্যাহত রাখার এবং সামগ্রিক অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত নিরসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আরও কিছু প্রশাসনিক জটিলতা সামনে এসেছে। জানা গেছে, একটি হেভি ডিউটি ফটোকপিয়ারের জন্য চুক্তি করা হয়েছিল এবং প্রথম লটে চার লাখ ৮২ হাজার টাকার আসবাবপত্র কেনা হয়েছে। দ্বিতীয় লটে আরও ৯ লাখ ৯১ হাজার টাকার আসবাবপত্র কেনার চুক্তি হয়েছে এবং মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু গত ৫ এপ্রিল অর্থবিভাগের জারি করা এক পরিপত্রে কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় স্থগিত করা হলে চুক্তি হওয়া সব ক্রয় কার্যক্রম বাতিল হয়ে যায়।
এছাড়া মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পে নিয়োজিত ৭ জন সেবাকর্মীকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাধ্যতামূলক সার্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত করতে হবে। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষে কোনো কর্মী কর্মহীন হলে পেনশন স্কিমের চাঁদা পরিশোধের বিষয়ে সরকারি নীতিমালায় কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় কর্তৃপক্ষ দ্বিধায় পড়েছে। পাশাপাশি সেবাকর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক পোশাকের বিধান থাকলেও, পোশাক কেনার ব্যয়সীমা নির্ধারণের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এমনকি পরামর্শকদের দায়িত্ব পালন নিয়েও কিছু জটিলতা রয়ে গেছে।
তবে প্রকল্পের এই আমূল পরিবর্তন নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের প্রতিনিধি মোহাম্মদ সাজেদুল হাসান। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভায় অংশ নেওয়া তিনি ‘আগামীর সময়’কে জানান, নাম পরিবর্তন ও নতুন কার্যক্রম যোগ করার বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়নি, বরং আগের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে নতুন কাজ যুক্ত করায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে মূল ফোকাস ছিল, সেখান থেকে বিচ্যুতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ছোট কাজগুলো সাধারণত বেশি সহজ এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।











