নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত বিল্লালের মরদেহটি এখন কেবল একটি মৃতদেহ নয়, বরং হয়ে দাঁড়িয়েছে দুটি ভিন্ন বিশ্বাসের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। দাফন নাকি দাহ—কোন রীতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে বাবা ও মায়ের বিপরীতমুখী দাবিতে পাঁচ দিন ধরে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে পড়ে আছে নিহতের মরদেহ। এই পারিবারিক ও ধর্মীয় বিরোধের নিষ্পত্তি এখন আদালতের হাতে ন্যস্ত।
বর্তমানে মরদেহটি নারায়ণগঞ্জ সদর থানার সামনে রাখা হয়েছে। নিহতের মায়ের দাবি, তার ছেলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাই তাকে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী দাফন করা হোক। অন্যদিকে, হিন্দু ধর্মে জন্ম নেওয়া ছেলের শেষকৃত্য দাহের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে চান বাবা। দুই পক্ষের এই অটল অবস্থানে শেষ পর্যন্ত মরদেহটি কোনো গন্তব্য খুঁজে পায়নি, ফলে পুলিশি তত্ত্বাবধানে তা সংরক্ষণ করতে হচ্ছে।
নিহত বিল্লালের ভাই ইব্রাহিম জানান, তাদের জীবন পরিবর্তনের গল্পটি ছিল যৌথ। তিনি দাবি করেন, তারা দুই ভাই একসঙ্গে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সুন্নতে খতনা করিয়েছিলেন। এরপর নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার একটি মাদ্রাসায় তারা একসঙ্গে দ্বীনি পড়াশোনা করেন। স্থানীয় সূত্র এবং পরিবারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর আইনি হলফনামার মাধ্যমে শুভ নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘বিল্লাল’ রাখেন। পরবর্তীতে তিনি মুসলিম রীতিতে বিয়ে করে একটি মুসলিম পরিবারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছিলেন বলে দাবি তাদের।
দীর্ঘদিন মরদেহটি অ্যাম্বুলেন্সে সংরক্ষিত থাকায় পরিবারটি চরম আর্থিক ভোগান্তির মুখে পড়েছে। লাশবাহী গাড়ির চালক জানান, প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকা হিসেবে প্রায় ৯৬ ঘণ্টার বিল জমেছে, যা পরিশোধ করা পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘ এই সময়ে নিহতের ভাই ছাড়া আর কাউকেই মরদেহ দেখতে আসতে দেখেননি।
ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত সোয়া ১টার দিকে। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামলের সামনের সড়কে অতর্কিত হামলা করে গুলি করে হত্যা করা হয় বিল্লালকে। পুলিশি অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি পাঁচটি গুলির খোসা এবং মরদেহের পাশ থেকে ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জেলা গোয়েন্দা পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে অভিযান চালায় এবং সুমন ওরফে মাইগ্যা সুমন, সিয়াম আহমেদ সিজান ও সোহান নামে তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে পরিবারের একটি পুরনো ইতিহাস। জানা গেছে, ২০০৩ সালে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস ও মা আয়েশা বেগমের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক হয়ে যায়। এরপর শুভ, তার মা এবং ভাই-বোন সম্মিলিতভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরের পর হলফনামার মাধ্যমে শুভ নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘বিল্লাল’ রাখেন এবং মুসলিম রীতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
একদিকে বিল্লাল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে তার শেষ বিদায় কোন ধর্মীয় রীতিতে হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন আদালতের ওপর ন্যস্ত। পাঁচ দিন ধরে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে থাকা মরদেহের শেষ ঠিকানা কোথায় হবে, সেই অনিশ্চয়তার মাঝে দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।

















