মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মার্কিন মুদ্রানীতির সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকলেও, এবার ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) চলতি বছর সুদের হার আরও বৃদ্ধি করতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় এই মূল্যবান ধাতুর দাম কমেছে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা এখন কার্যত ঢাকা পড়ে গেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২৪ ডলার ৬০ সেন্টে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে আগামী আগস্টে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত মার্কিন সোনার ফিউচার চুক্তি বা ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্যের ক্ষেত্রেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এই মূল্য শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৯ ডলার ৫০ সেন্টে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জুনের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব প্রতিফলিত হয়নি। মূলত গত মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা সাময়িকভাবে বাজারকে আশ্বস্ত করেছিল। তবে বর্তমানে সেই চুক্তি কার্যত ভেস্তে যাওয়ায় বাজারে পুনরায় অনিশ্চয়তা ফিরে এসেছে। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে, যার ফলে সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে চড়া রাখার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সাধারণত সোনার দাম বৃদ্ধি পায়। তবে সুদের হার বেশি থাকলে বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক খাতে বিনিয়োগ অধিক লাভজনক হয়ে ওঠে, যার ফলে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কমে যায়। সংঘাত শুরু হওয়ার আগে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ও উৎপাদক পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে। ফলে আর্থিক বাজারগুলো এখন আর নিশ্চিত হতে পারছে না যে, ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর সুদের হার বাড়ানো থেকে বিরত থাকবে কি না।
সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা এখনো আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বৃদ্ধির ৭৩ শতাংশ সম্ভাবনা ধরে নিয়ে বাজারে লেনদেন করছেন। এই বিষয়ে ফেড গভর্নর লিসা কুক বুধবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে সুদের হার বাড়াতে তিনি প্রয়োজনীয় ‘পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত’। একই সঙ্গে ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ-ও মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, যদিও তিনি তা কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সংকেত দেননি।
সোনার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামেও পতন এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট সিলভার বা রুপার দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫৬ ডলার ৭৮ সেন্টে নেমেছে। এছাড়া প্ল্যাটিনামের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১ হাজার ৬৫২ ডলার ৫০ সেন্ট এবং প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ২৯৬ ডলার ২৯ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ববাজারের এই প্রভাব বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও প্রতিফলিত হয়েছে। ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের সোনার দাম বর্তমানে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৯ হাজার ৮৯৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, রুপার বাজারেও দামের পরিবর্তন দেখা গেছে। দেশে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৬০৭ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৩ হাজার ৭৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা ২ হাজার ৮৫৮ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে।











