কুয়েতে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও কুয়েত সরকারের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে সরকারি বিধি মোতাবেক দেশটিতে নারী গৃহকর্মী প্রেরণ বর্তমানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং বন্ধ রয়েছে। তবে আইনের এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে কুয়েতের ভিসা সংগ্রহের এক অশুভ কারসাজি চলছে। একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সাধারণ নারীদের প্রলুব্ধ করছে, যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস।

দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ‘নারী গৃহকর্মী (খাদ্দামা) ভিসা’ সত্যায়িত করার কোনো আইনি সুযোগ তাদের নেই। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, দূতাবাস থেকে কোনো অনুমোদন বা সত্যায়ন না মিললেও দালাল সিন্ডিকেটগুলো বিকল্প এবং সম্পূর্ণ অবৈধ পথে বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মীদের কুয়েতে পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই অবৈধ প্রক্রিয়ার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুক ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। সেখানে অত্যন্ত চটকদার এবং বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নারী কর্মীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। একটি ভিডিওতে স্পষ্টভাবে শোনা যায়, ‘যারা আগে অন্য দেশে ছিলেন, ভাষা জানেন কিন্তু বর্তমানে অন্য দেশে যেতে পারছেন না, এমনকি যাদের বয়স ৪৫ বছর পর্যন্ত, তারাও দ্রুত যোগাযোগ করুন।’

এই পুরো চক্রের নেপথ্যে যার নাম উঠে এসেছে, তিনি হলেন ‘মনজু’ নামক এক দালাল। কুয়েত, সৌদি আরব, জর্ডান এবং বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ভিসা কেনাবেচার জন্য তিনি দেশে একটি অবৈধ অফিস স্থাপন করেছেন। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনজুর এই অপরাধী হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক করুণ অথচ অদ্ভুত ইতিহাস। প্রায় ৫ বছর আগে তিনি নিজেই একজন দালালের খপ্পরে পড়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে উচ্চ বেতনের ভালো কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তাকে মরুভূমির মানবেতর পরিবেশে উট ও দুম্বা লালন-পালনের কঠিন শ্রমে নিযুক্ত করা হয়। সেই কষ্টের দিনগুলোর ভিডিও করে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করতে শুরু করেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয় এবং ফেসবুক-টিকটকে তার অনুসারীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে সেখান থেকে পালিয়ে তিনি অবৈধভাবে অন্য কাজ শুরু করেন। তবে তার কফিল বা মালিক আকামা বাতিল করে দিলে তিনি সম্পূর্ণ অবৈধ হয়ে পড়েন এবং ভিসা নবায়ন করতে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে সোশ্যাল মিডিয়ার সেই পরিচিতিকে পুঁজি করে তিনি দেশি-বিদেশি দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মেলান। গড়ে তোলেন নিজস্ব অফিস এবং পুরোদমে শুরু করেন ভিসার রিভিউ ও কেনাবেচার ব্যবসা। সমালোচকদের জবাবে তিনি অত্যন্ত দম্ভের সঙ্গে বলেন, ‘আমাকে যারা দালাল বলো, আমি মনজু দালাল ধাক্কা খেয়ে (আঞ্চলিক শব্দে ‘ঠাপাইয়া’) ইন্টারন্যাশনাল দালাল হয়েছি।’

এই অবৈধ ভিসা প্রক্রিয়ার রহস্য উদঘাটন করতে এবং কার মাধ্যমে এই ভিসাগুলো সত্যায়িত হচ্ছে তা জানতে সংবাদকর্মী পরিচয়ে মনজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ফোন রিসিভ করার পরপরই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, যা এই চক্রের রহস্যময় কার্যক্রমকেই ফুটিয়ে তোলে।

এদিকে, গত ২ জুলাই কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে নারী গৃহকর্মী প্রেরণের বিষয়ে একটি জরুরি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে এক ভয়াবহ বাস্তবতার কথা জানানো হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, গত মাত্র তিন মাসেই অন্তত সাতজন বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মী কুয়েতে মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের kondisi অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় দূতাবাস তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ হেফাজতে নেয় এবং দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ও কুয়েত সরকারের মধ্যে কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার আগে কোনো বাংলাদেশি নারীর গৃহকর্মী হিসেবে কুয়েতে যাওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের অমানবিক ও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা প্রতিরোধ করতে অসাধু চক্রের প্রলোভন থেকে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এই সিন্ডিকেটকে রুখে দিতে সামাজিক সচেতনতা এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছে দূতাবাস। এই অসাধু চক্রের কোনো তথ্য জানা থাকলে তা অবিলম্বে কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস অথবা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা স্বার্থান্বেষী মহলের অপপ্রচারে এবং লোভনীয় প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হন।