জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেছেন, জুলাই মাসে যে গণঅভ্যুত্থানের লড়াই শুরু হয়েছিল, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছিল না; বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, এই লড়াই অব্যাহত থাকবে। রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী শহীদ সাংবাদিকদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ‘ফ্যাসিবাদী শাসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) ‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা’ শীর্ষক এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, সংবাদমাধ্যমের মূল কাজই হলো প্রশ্ন করা। সাংবাদিকদের মৌলিক অধিকারই হলো যথাযথভাবে প্রশ্ন করা বা ‘টু আস্ক কোশ্চেনস’। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সাংবাদিকরা এই সাহসী পথ থেকে আর পিছিয়ে আসবেন না, ইনশাআল্লাহ। শহীদ পরিবারের প্রতি আবেগঘন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ‘আমার দেশ’ সম্পাদক বলেন, “আমি শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাঁদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। এই তরুণ শহীদরা যদি তাঁদের জীবন উৎসর্গ না করতেন, তবে আমরা হয়তো এই স্বাধীনতা ফিরে পেতাম না। আমি আমার দীর্ঘ নির্বাসনজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরতে পারতাম না এবং ‘আমার দেশ’ পত্রিকা পুনরায় চালু করা সম্ভব হতো না। তাই তাঁদের এই মহান আত্মত্যাগের কাছে আমি চিরঋণী।”

ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, এর মাধ্যমে আমরা সারাদেশের সকল সংবাদপত্রের সম্পাদকদের একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে চেয়েছি। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিনের ‘এলিটিজম’ বা অভিজাত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছি। অতীতের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এর আগে সম্পাদকদের নামে একটি নির্দিষ্ট অভিজাত শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ দেখা গেছে। এনইসি চায় ঢাকার বাইরের প্রান্তিক সম্পাদকদেরও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে। এছাড়া তাঁর মতে, এনইসি-র অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো জাতিকে সার্বক্ষণিকভাবে সজাগ রাখা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।

ফ্যাসিবাদের উত্থান ও মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের যে ভয়াবহ উত্থান হয়েছিল, তার পেছনে সংবাদমাধ্যমেরও এক বড় দায় রয়েছে। বিশেষ করে মিডিয়ার তোষামোদপ্রবণ মানসিকতার কারণেই ফ্যাসিবাদ এতটা শক্তিশালী ও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পেরেছিল। ‘আমার দেশ’ সম্পাদক বলেন, “একটি বড় সমস্যা হলো, আমরা জাতি হিসেবে তোষামোদকারী এবং তোষামোদ পাওয়াকে পছন্দ করি। এটি আমাদের জাতীয় চরিত্রের এক অদ্ভুত এবং নেতিবাচক দিক। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল কোনো ধরনের তোষামোদিতে বিশ্বাস করে না।”

দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক, কবি ও গবেষক আবদুল হাই শিকদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেস সেক্রেটারি মারুফ কামাল খান সোহেল। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশনের সম্পাদক মোকাররম হোসেন, ডেইলি ওয়াদারের সম্পাদক ও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল। এছাড়া আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা শামসি আরা জামান এবং মেহেদী হাসানের স্ত্রী ফারহানা পপি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শেষে জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া পাঁচজন সাংবাদিকের পরিবারের সদস্যদের হাতে নগদ ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা এবং সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন উপস্থিত অতিথিবৃন্দ।