ছাত্র-জনতার শক্তির সামনে আর কোনো ‘স্ট্যান্টবাজি’ চলবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ে আয়োজিত এক বিশাল ‘জুলাই পদযাত্রা ও পথসভা’য় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনের ওপর স্থাপিত একটি অস্থায়ী মঞ্চে এই পথসভার আয়োজন করা হয়, যেখানে বিপুল সংখ্যক দলীয় নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়।
বক্তব্যের শুরুতেই বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন জনসভায় ঘোষণা করেন যে শিক্ষা ব্যবস্থায় আর কোনো নকল চলবে না, কিন্তু বাস্তবে ২০২৬ সালের শিক্ষার্থীরাই প্রমাণ করে দিচ্ছে যে এই ধরণের ফাঁপা প্রতিশ্রুতি বা ‘স্ট্যান্টবাজি’ বাংলাদেশে আর কার্যকর হবে না। তিনি আক্ষেপের সাথে উল্লেখ করেন, বুকসমান এবং হাঁটুসমান পানির মধ্যে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ডুবিয়ে-ডুবিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যা চরম অমানবিক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বহিঃপ্রকাশ। শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও চরম গাফিলতি করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। প্রশ্নের মধ্যে ভুল রাখা হয়েছে, যা একজন পরীক্ষার্থীর মানসিক অবস্থার ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা একবার চিন্তা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও অভিযোগ করেন, এই চরম অব্যবস্থাপনার পর দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের প্রতি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন এবং তাদের ‘ফার্মের মুরগি’ ও ‘মাদকাসক্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। শিক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, যাদেরকে ‘ফার্মের মুরগি’ বলা হচ্ছে, সেই সাহসী শিক্ষার্থীরাই রাস্তায় নেমে এসেছিল বলেই আজ আপনি শিক্ষামন্ত্রী হয়ে বসতে পেরেছেন। এই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণেই কেউ কেউ শিলং থেকে এসে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হয়েছেন, আর কেউ লন্ডন থেকে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন দেখছেন। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, শিক্ষার্থীরা কোনো গবেষণাগারের গিনিপিগ নয় এবং তাদের নিয়ে কোনো ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আপনাদের নিজেদের সন্তানরা কি দেশে পড়াশোনা করে? না, তাদের বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাই দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কষ্ট আপনারা অনুভব করতে পারছেন না।
পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনায় নামেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সংসদে অত্যন্ত দম্ভের সাথে দাবি করেছেন যে সংবিধান সংস্কার কমিটির কথা সংবিধানে নেই। এর জবাবে তিনি বিদ্রুপের সুরে বলেন, যদি কেবল সংবিধানের কথা ধরা হয়, তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনও কোনো সংবিধানে ছিল না। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। তিনি আরও বলেন, সংবিধান অনুযায়ী আপনার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর) থাকার কথা ছিল শিলংয়ে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর থাকার কথা ছিল লন্ডনে এবং আপনাদের নেতাকর্মীদের থাকার কথা ছিল ধানক্ষেতে বা ঢাকা শহরের রাস্তায় রিকশা চালানোর কাজে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ছাত্র-জনতা এই পুরনো সংবিধানের সীমাবদ্ধতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নতুন বাংলাদেশের এক নতুন অভিমুখ সেট করেছে, কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আপনারা জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ছাত্র-জনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কক্সবাজার, সাতকানিয়া, আনোয়ারা এবং বাঁশখালীর মতো বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর মানুষ বর্তমানে চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সাত দিনের বেশি সময় ধরে বন্যা পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলেও সরকারি পক্ষ থেকে সব এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ও সাহায্য-সহযোগিতা পৌঁছায়নি, যা সরকারের চরম ব্যর্থতা ও উদাসীনতাকে প্রকাশ করে।
স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সোনারগাঁয়ের বর্তমান সংসদ সদস্যের ছেলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, এই এলাকার এমপির ছেলে চাঁদাবাজির অভিযোগে থানায় গিয়ে মুচলেকা দিয়েছেন। এটি একটি চরম লজ্জাজনক পরিস্থিতি যে, বাবা সংসদ সদস্য হয়েও ছেলে চাঁদাবাজি করে থানায় হাজিরা দেয়।
জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারা দেশে গ্যাসের হাহাকার চলছে, অথচ রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে কিছু প্রভাবশালী কারখানা প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত মাইল জমি দখল করছে এবং তাদের অনুগত মিডিয়াগুলোর মাধ্যমে এই দখলদারির পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বর্তমানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে প্রতি ২০০ টাকা আয় করলে তার ৫০ টাকা বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল এবং স্থানীয় এমপিদের চাঁদা হিসেবে দিতে হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চাঁদাবাজির এই সংস্কৃতি আর চলবে না। যারা মনে করছেন এভাবে অনির্দিষ্টকাল চাঁদাবাজি চালিয়ে যেতে পারবেন, তারা ভুল ভাবছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ১৭ বছর লেগেছিল, কিন্তু প্রতি বছর জুলাই আসে না; তবে যখন জুলাই আসে, তখন পালানোর জায়গা পাওয়া যায় না।
পথসভার শেষ পর্যায়ে হাসনাত আবদুল্লাহ এনসিপির পক্ষ থেকে সোনারগাঁ উপজেলা চেয়ারম্যান পদে তুহিন মাহমুদ, পৌরসভার মেয়র পদে মোস্তফা এবং পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে শাকিল সাইফুল্লাহকে সমর্থন ঘোষণা করেন। এই সভায় আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন, জেলা এনসিপির আহ্বায়ক যুবাইর সরদার, মহানগরের আহ্বায়ক শওকত আলী, জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র সহ-সভাপতি তুহিন মাহমুদ, সাকিল সাইফুল্লাহ এবং জাহিদুল হক বাঁধনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।











