যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির দিশারি: গ্রামীণ ইয়েমেন ফাউন্ডেশনের অনন্য সাফল্য

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, চরম দারিদ্র্য আর মানবিক সংকটে জর্জরিত ইয়েমেনে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্রামীণ ইয়েমেন ফাউন্ডেশন (জিওয়াইএফ)। ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক ব্যবসার এক সমন্বিত মডেলের মাধ্যমে ইয়েমেনের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে এই প্রতিষ্ঠানটি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্ভাবিত বৈশ্বিক মাইক্রোক্রেডিট ও সোশ্যাল বিজনেস ধারণার ওপর ভিত্তি করে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ফাউন্ডেশনটি বর্তমানে ইয়েমেনের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বদলে দিচ্ছে।

২০২০ সালের জুলাই মাসে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে জিওয়াইএফ অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে যেখানে পুঁজির অভাব প্রকট, সেখানে প্রতিষ্ঠানটি ১২ হাজারেরও বেশি নারী উদ্যোক্তার ক্ষুদ্র উদ্যোগে ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগ কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বরং হাজারো নারীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও অসংখ্য নারী টেকসই জীবিকা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন এবং প্রায় ৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে জিওয়াইএফ ইয়েমেনের জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। জ্বালানি সংকটের সমাধানে ৭ হাজার ৫৮৮টি সৌরবিদ্যুৎ হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যা প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় আলো নিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৩টি ক্লেফট লিপ ও প্যালেট অস্ত্রোপচার এবং ৯ হাজার ১৬১টি ছানি অপারেশন সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধির নিশ্চিতে ৪ হাজার ৫৬২টি পারিবারিক পানির ট্যাংক এবং ৭২৫টি শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে ৫ হাজার সেট বিছানাপত্র বিতরণ এবং ৯ হাজার ২০০টি জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তিতে সহায়তা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

স্বাস্থ্যসেবাকে আরও বিস্তৃত করতে জিওয়াইএফ বর্তমানে আটটি কিডনি পরিচর্যা কেন্দ্র পরিচালনা করছে, যা ইয়েমেনের রোগীদের জন্য এক বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশুপালন ইয়েমেনের অর্থনীতির একটি বড় অংশ, তাই ৭৩ হাজার ৫০৪টি গবাদিপশুকে টিকা প্রদান এবং ১ হাজার ৩১টি পশু আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করা হয়েছে। শিক্ষা খাতের উন্নয়নে ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি বই বিতরণের পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য ২০টিরও বেশি গণশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার আলো পৌঁছায় সমাজের প্রতিটি স্তরে।

এই বিশাল কার্যক্রমের কারিগরি দিকটি তদারকি করছে গ্রামীণ ট্রাস্ট। বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত গ্রামীণ মডেলকে ইয়েমেনের স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর করতে গ্রামীণ ট্রাস্ট ছয়জন বিশেষজ্ঞ রিসোর্স পার্সন নিয়োগ দিয়েছে। বর্তমানে দুজন প্রকল্প পরিচালক ও শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে আরও চারজন বিশেষজ্ঞ যোগ দেবেন। বর্তমানে জিওয়াইএফ ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আনুষ্ঠানিক মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই লাইসেন্স প্রাপ্তি হলে এটি হবে ইয়েমেনের প্রথম গ্রামীণ মডেলভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক এবং বাংলাদেশের বাইরে গ্রামীণ ট্রাস্টের আন্তর্জাতিক রিপ্লিকেশন কর্মসূচির আওতায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম ব্যাংক।

জিওয়াইএফ-এর লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। ২০৫০ সালের মধ্যে তারা ৩৫০টি শাখার মাধ্যমে ১০ লাখ ৬৩ হাজার ১১৬ জন নারী সদস্যের কাছে পৌঁছাতে চায়। এর মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং ইয়েমেনের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারে তারা অগ্রণী ভূমিকা রাখতে প্রত্যাশী। সম্প্রতি 'সোশ্যাল বিজনেস ডে ২০২৬'-এর সাইডলাইনে গ্রামীণ ইয়েমেন ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের এই সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। প্রফেসর ইউনূস এই অগ্রগতিতে গভীর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, "বিশ্বের অন্যতম নাজুক পরিবেশেও গ্রামীণ ইয়েমেন প্রমাণ করছে যে, সামাজিক উদ্ভাবন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সমন্বয় মানুষের জীবন বদলে দিতে এবং আরও সহনশীল ও টেকসই সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম।"