রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাস, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পুলিশ বাহিনীর তীব্র জনবল ও যানবাহনের সংকট নিরসনে এক সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বর্তমান সরকার। দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা ভেঙে ১৮ জন মন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ বিশেষ পুলিশ এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে দাপ্তরিক দায়িত্বের গুরুত্ব এবং সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনা করে ছয়জন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার জন্য এই বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ এবং ব্যয় সংকোচনের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমে নিজের নিরাপত্তা বহরের আকার ছোট করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রধানমন্ত্রীর এই দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহ থেকে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মন্ত্রীর বিশেষ পুলিশ এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার কার্যক্রম কার্যকর করা হয়েছে। বিষয়টি একাধিক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ নজমুল হুদা শনিবার গণমাধ্যমকে জানান, গত সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা জারি হওয়ার পরপরই তা বাস্তবায়ন করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে মন্ত্রীর নিরাপত্তায় কেবল একজন গানম্যান দায়িত্ব পালন করছেন, যার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্যানুসারে, বর্তমান সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজধানীর অভ্যন্তরে যাতায়াতের সময় অধিকাংশ পূর্ণমন্ত্রীকে বিশেষ পুলিশ এসকর্ট প্রদান করা হয়েছিল। বর্তমানে মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রীর সংখ্যা ২৪ জন। যদিও বিশেষ এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে, তবুও প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী মন্ত্রীরা তাদের ব্যক্তিগত গানম্যান, সরকারি বাসভবনে নিয়োজিত নিরাপত্তারক্ষী এবং রাজধানীর বাইরে সরকারি সফরে প্রয়োজনীয় পুলিশি নিরাপত্তা আগের মতোই পাবেন।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ সদর দপ্তরকে ভিআইপি নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কমানোর কঠোর নির্দেশনা দেয়। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল আর্থিক সাশ্রয় নয়, বরং পুলিশ সদস্য ও অপারেশনাল যানবাহনের দীর্ঘদিনের সংকটও অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে। সাধারণত একজন মন্ত্রীর এসকর্ট টিমে একজন উপপরিদর্শক (এসআই), চারজন কনস্টেবল এবং একটি পুলিশ পিকআপ ভ্যান থাকে। এই সদস্যদের বেতন-ভাতা এবং যানবাহনের জ্বালানি ব্যয় সম্পূর্ণ সরকার বহন করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। উল্লেখ্য, প্রতিমন্ত্রীরা আগে থেকেই এই বিশেষ এসকর্ট সুবিধার আওতায় ছিলেন না।
যাদের জন্য বিশেষ এসকর্ট সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে, তারা হলেন— স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, নারী ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী ড. এজেডএম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অন্যদিকে, যেসব মন্ত্রীর বিশেষ এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে, তারা হলেন— ধর্মবিষয়কমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান, সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রীতা), শিল্প, বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জাহির উদ্দিন স্বপন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
ডিএমপির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে ৪৯ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় ১ হাজার ৬৯১ জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত আছেন, যেখানে প্রকৃত প্রয়োজন ২ হাজার ৫৭৫ জন। ফলে প্রায় ৯০০ জন সদস্যের এক বিশাল ঘাটতি রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এই তীব্র জনবল সংকটের কারণে অনেক সদস্যকে বিরতিহীনভাবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
এর পাশাপাশি, গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন পুলিশ স্টেশন ও স্থাপনায় চালানো হামলায় ভিআইপি নিরাপত্তা ইউনিটের বেশ কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে বর্তমানে একাধিক ভিআইপির নিরাপত্তায় একই যানবাহন ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। সীমিত জনবল এবং যানবাহনের এই চরম সংকট মোকাবিলা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের জন্য দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছিল, যার সমাধান হিসেবেই এই ব্যয় সংকোচন ও সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।











