ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা থেকে ছাত্রলীগের বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রস্থান নয়, বরং এটি ছিল বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের চূড়ান্ত বিজয়ের এক সুস্পষ্ট সংকেত। এই মতটি ব্যক্ত করেছেন ডাকসু ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম)। শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি এই কথা বলেন। সভার শিরোনাম ছিল ‘জুলাইয়ে সঞ্চারিত সাহস: গণরুম-গেস্টরুম পেরিয়ে নির্যাতনমুক্ত ক্যাম্পাস’।
সভাপতির বক্তব্যে ডাকসু ভিপি আবু সাদিক জোর দিয়ে বলেন, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা থেকে ছাত্রলীগ বিদায় নিল, তখনই এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে দেশে ফ্যাসিবাদের দিন শেষ এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আর কোনো ‘গণরুম’ বা ‘গেস্টরুম’-এর মতো অমানবিক ও ভয়ংকর সংস্কৃতি বিদ্যমান নেই। দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া পেশিশক্তির রাজনীতি এবং জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের যে অপরাজনীতি চলেছিল, তা এখন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ক্যাম্পাসের সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট নিরসনে এবং এর স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বর্তমানে নিবিড়ভাবে কাজ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ১৭ জুলাইয়ের সন্ত্রাসবিরোধী দিবস থেকে প্রশাসনকে শিক্ষা নিতে হবে। ক্যাম্পাসে যদি পুনরায় কোনো সংগঠনকে ছাত্রলীগীয় ধাঁচে গণরুম বা গেস্টরুম সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে প্রশাসনকে চরম পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
একই আলোচনা সভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন দুই সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমের অবস্থান স্পষ্ট করার জোরালো আহ্বান জানান বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সানাউল্লাহ হক। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আবদুল কাদেরের করা কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাসনাত ও সারজিসের অবস্থান পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। শেখ হাসিনার পতনের পক্ষে নাকি বিপক্ষে তারা ছিলেন—এই বিষয়ে যদি তারা খোলাসা না করেন, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আবদুল কাদের অভিযোগ করেছিলেন যে, ডিবি কার্যালয় থেকে মুক্তির পর আন্দোলনের গতিবিধি নিয়ে হাসনাত ও সারজিস আপত্তি জানিয়েছিলেন। এই রহস্যের অবসান ঘটিয়ে স্বচ্ছতা আনয়নের দাবি জানান সানাউল্লাহ।
আলোচনা সভায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক কাজী আশিক দীর্ঘ ১৬ বছরের তথাকথিত ‘একমুখী বয়ান’ তৈরির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দূরত্ব ঘুচিয়ে ক্যাম্পাসে একটি মুক্ত ও সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আবাসন সংকটের দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল সংসদের ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। তারা একযোগে ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা মনে করেন, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি প্রকৃত জ্ঞানতৃষ্ণার কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হবে না।











