সেনাবাহিনীর স্পষ্ট ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই নাহিদ ইসলাম ‘এক দফার’ ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে আসা বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ এবং এর পেছনের কারসাজি নিয়ে গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।

রাশেদ খাঁন তার পোস্টে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাহফুজ আলমের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, আব্দুল কাদের গণঅভ্যুত্থানের বিষয়ে কিছু তথ্য প্রকাশের পর মাহফুজ আলম কৌশলে সব অবদান ছাত্রশিবিরের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। রাশেদের দাবি, মাহফুজ আলম নিজেকে নিরাপদ করার জন্য এই পথ বেছে নিয়েছেন, যদিও এর আগে তিনি কখনোই প্রকাশ্যভাবে শিবিরের ভূমিকা স্বীকার করেননি।

ফেসবুক পোস্টে মাহফুজ আলমের একটি বিবৃতির কথা উল্লেখ করে রাশেদ জানান, অসহযোগ আন্দোলনের খসড়া প্রস্তুত করা এবং এক দফার ঘোষণার বিষয়ে জামায়াতের ‘সংগ্রাম’ পত্রিকা ও সাদিক কায়েমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মাহফুজ আলম লিখেছিলেন যে, তিনি সাদিক কায়েমকে খসড়া তৈরি করতে বলেন এবং আসিফ মাহমুদ তা পাঠান। কিন্তু রাশেদ খাঁনের দাবি, ঘটনাটি ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘কীভাবে বয়ান সৃষ্টি করতে হয়, জামায়াত খুব ভালো করেই জানে! অথচ এক দফার ঘোষণা আসিফ মাহমুদ নয়, বরং নাহিদ ইসলাম পাঠিয়েছিলেন। আসিফ মাহমুদ পাঠিয়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলন পালনের দিকনির্দেশনা।’

কৃতি বা ক্রেডিটের বিষয়ে স্পষ্ট কথা বলে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘শিবিরের যতটুকু অবদান, ততটুকুর ক্রেডিট নিলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তা অতিরঞ্জিত করতে গেলেই গণ্ডগোল তৈরি হবে।’ তিনি আরও জানান, গণঅভ্যুত্থানের সময় সাদিক কায়েম ‘সালমান’ পরিচয়ে কাজ করতেন, যা একটি চিরন্তন সত্য। এখন যদি অতিরিক্ত ক্রেডিটের লোভে দাবি করা হয় যে তিনি সাদিক কায়েম পরিচয়েই কাজ করেছেন, তবে তা হবে সম্পূর্ণ অসত্য। তার মতে, যার যতটুকু অবদান, তার বেশি দাবি করার সুযোগ নেই।

সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে রাশেদ খাঁন বলেন, মাহফুজ আলম তার লেখায় ‘একটি নির্দিষ্ট কোয়ার্টার’ বলতে মূলত ক্যান্টনমেন্টকে বুঝিয়েছেন, যা ইতিপূর্বে নাহিদ ইসলামও উল্লেখ করেছিলেন। রাশেদ দাবি করেন, ২ আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় এবং ৩ আগস্ট সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে বৈঠকের পর সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন যে, সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার বুকে গুলি চালাবে না। এই ঘোষণাটিই সাধারণ জনতাকে সাহস জুগিয়েছিল। মূলত ১ আগস্টই সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা জনগণের পক্ষে অবস্থান করবে।

এই বিএনপি নেতার ভাষ্যমতে, কার্যত ১ আগস্টই শেখ হাসিনার পতন নির্ধারিত হয়ে যায় এবং সেই সংকেত প্রধানমন্ত্রীসহ অধিকাংশ এমপি ও মন্ত্রীরা পেয়ে যান। আর এই কারণেই ওই সময় থেকেই অনেকে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি শুরু করেন। ক্যান্টনমেন্টের ভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি রূপক অর্থে সেনাবাহিনীর অবদান বোঝাতে গিয়ে বলেছি যে, স্পষ্ট ক্লিয়ারেন্স পেয়ে নাহিদ ইসলাম এক দফার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আশা করি আমার বক্তব্য বুঝতে পেরেছেন। এখানে নাহিদ ইসলামের যেমন ভূমিকা ছিল, তেমনি সেনাবাহিনীরও ভূমিকা ছিল।’

সবশেষে গণঅধিকার পরিষদের সাবেক এই নেতা উল্লেখ করেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্রশিবিরসহ সব ছাত্র সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনতার সম্মিলিত ভূমিকা ছিল। এক দফার ঘোষণাটি ছিল একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, যেখানে কার অবদান কম আর কার বেশি তা ভিন্ন হতে পারে। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি করে বলেন, ১৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত হাসনাত এবং সারজিস পলিসি মেকিং বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন না। সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে যাওয়ার কারণে সন্দেহের অবকাশ থাকায় তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। আব্দুল কাদেরের করা বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব এখন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের, রিফাত রশিদ এবং মাহিন সরকারের ওপর বলে মন্তব্য করেন তিনি।