কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতারা যাতে নির্দলীয় প্রতীকের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশ নিতে না পারে, সেই লক্ষ্যে বিশেষ বিধান প্রণয়নের প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের কাছে পেশ করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, সরকার যেসব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, সেই দলগুলোর পদধারী বা সক্রিয় নেতা-কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ‘অংশগ্রহণের অযোগ্য’ ঘোষণা করতে হবে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রস্তাবিত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় এই শর্তটি যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণ বিধিমালা হালনাগাদ করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত জানতে গত ১০ জুন চিঠি পাঠিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরিত একটি মতামতপত্র নির্বাচন কমিশনকে প্রদান করা হয়। ওই চিঠিতে জামায়াত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব এবং দুটি বিশেষ প্রস্তাব বিবেচনার জন্য ইসি-র কাছে অনুরোধ জানায়।
এই প্রস্তাবের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে মিয়া গোলাম পরওয়ার শনিবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, “নির্বাচন কমিশন স্থানীয় নির্বাচনের বিধিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে সব দলের কাছে মতামত চেয়েছে। আমরা সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের মতামত প্রদান করেছি।” আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “সরকার যেহেতু একটি নির্দিষ্ট আইনের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, তাই সরকার যে আইন দ্বারা কোনো দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে, সেই আইনের আওতায় নির্বাচনও একটি কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। ফলে ওই একই নির্দেশের কারণে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য থাকে না। আমরা সেটাই বলেছি। যতক্ষণ তারা নিষিদ্ধ থাকবে, ততক্ষণ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য থাকবে। এটি নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব।”
তবে জামায়াতের এই প্রস্তাবের বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। শনিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কে কী মতামত দিয়েছে, সব দলের মতামত একীভূত করে ইসি সচিবালয় আমাদের কাছে উপস্থাপন করবে। সেখান থেকে যেগুলো গ্রহণযোগ্য বলে মনে হবে, সেগুলো বিবেচনা করা হবে।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু নির্দলীয়, তাই যারা আইনগতভাবে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবেন, তারাই নির্বাচনে অংশ নেবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “দলীয় কোনো প্রার্থীর বিষয়ে আইন-বিধিতে আলাদা কিছু যুক্ত করা হচ্ছে না।”
একই সুর শোনা গেছে নির্বাচন বিশ্লেষক এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলীমের বক্তব্যে। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের বিষয়ে জামায়াতের দেওয়া প্রস্তাবটি মূলত আচরণবিধির বিষয় নয়। তিনি বলেন, “প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা বা অযোগ্যতার বিষয়টি সরাসরি আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট। এটি আচরণবিধির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় নয়। তাছাড়া এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, এখানে কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যারা প্রার্থী হওয়ার যোগ্য, তারাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।” আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করার আইনি সুযোগ নেই বলেও মনে করেন আলীম।
ঘটনার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রমে ২০২৫ সালের মে মাসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এই পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে, যার ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলটির অংশ নিতে পারেনি।
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে, তাই দলীয় মনোনয়নের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ফলে বর্তমান আইনি কাঠামোতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সরাসরি বাধা নেই। অক্টোবর মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ভোটের পরিকল্পনা সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন ওঠে—আওয়ামী লীগ নেতারা এতে অংশ নিতে পারবেন কি না।
এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত ৯ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে আওয়ামী লীগসহ যে কোনো দলের সদস্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তিনি বলেন, “এখানে কোনো বাধা নেই। একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান এবং তিনি যদি আওয়ামী লীগের সদস্য হন, তবুও তিনি অংশ নিতে পারবেন, কারণ এটি নির্দলীয় নির্বাচন। এখানে কেউ দলের কথা বলতে পারবেন না।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি কোনো নির্দলীয় প্রার্থী তার ক্যাম্পেইনে আওয়ামী লীগ বা তাদের আদর্শের কথা বলেন, তবে তা সমস্যা হবে। কিন্তু সাধারণ শর্তাবলি পূরণ করতে পারলে তিনি অবশ্যই নির্বাচন করতে পারবেন।”
আওয়ামী লীগের পদ-পদবি থাকা প্রার্থীর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, “সংগঠনের কর্মসূচি যেহেতু নিষিদ্ধ, তাই তিনি তার পদ-পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে ব্যক্তি হিসেবে তিনি যদি যোগ্য হন, তবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। সরকারের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই।”
মামলা থাকা প্রার্থীদের বিষয়ে তিনি জানান, “মামলা থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা যায়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের শর্তাবলিও অনেকটা সেরকম। সহজ করে বললে, সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের একসময়ের নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন, এমনকি মামলা বা জেলে থাকলেও। কারণ নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। এই সুযোগগুলো আগে ছিল এবং এখনও আছে।”
এদিকে গত ১৫ জুন জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর কাছে এই বিষয়ে স্পষ্টীকরণ চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এতে অংশ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত শোনা যাচ্ছে। কেউ বলছেন পারবেন, কেউ বলছেন পারবেন না। আবার কেউ বলছেন ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা থাকলে অংশ নিতে পারবেন। মন্ত্রী সাহেব বিষয়টি স্পষ্ট করলে সবার বুঝতে সুবিধা হতো।” জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মূল প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে কেবল বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে।”
জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রস্তাবনায় আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করেছে। তারা নির্বাচনী ক্যাম্প বা অফিসে টেলিভিশন বা ভি সিআর ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথা বললেও এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টর এবং ল্যাপটপের মতো ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান সংযোজনের দাবি জানিয়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারে বর্তমান মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—সকল নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে সংবাদকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা কমিশনের হাতে রাখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আপিল করার সুযোগ বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা। এছাড়া স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত কোনো প্রশাসক বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান তৈরির দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
বিশেষ প্রস্তাব হিসেবে জামায়াত দুটি বিষয় উল্লেখ করেছে: প্রথমত, ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচনের বর্তমান নিয়ম বাতিল করে প্রতিটি ওয়ার্ডে নারী সদস্যদের সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা। দ্বিতীয়ত, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের নির্বাচনে কারা ভোটার হবেন, সেই বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।











